ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

জাতীয় পরিচয়পত্র

সম্প্রসারণের আগে চাই সতর্কতা

সম্প্রসারণের আগে চাই সতর্কতা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির বয়সসীমা সম্প্রসারিত করার যে উদ্যোগ নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করতে যাচ্ছে, আমরা সেটাকে নিশ্চয়ই সাধুবাদ জানাই। যে দেশের প্রায় সবাই জন্মসূত্রে নাগরিক, সে দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য ১৮ বছর অপেক্ষা করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। রোববার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে দেশের ১০ বছর বয়সী নাগরিকদেরও পরিচয়পত্র দেওয়ার যে সিদ্ধান্তের কথা কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্র উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে- আমরা বরং সেখান থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে বলি। দেখা যাচ্ছে, বিলম্বে হলেও নাগরিকদের মধ্যে জন্মনিবন্ধন প্রবণতা বেড়েছে। আমরা মনে করি, তখনই জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি প্রাথমিক নম্বর প্রদান করা যেতে পারে। বিদ্যালয়ে ভর্তির সময়, প্রথম পাবলিক পরীক্ষার সময় এবং ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় ওই পরিচয়পত্র পর্যায়ক্রমে চূড়ান্ত করা যেতে পারে। আমরা দেখেছি, ২০০৮ সালে একটি ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুতের স্বার্থে যে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছিল, গত এক যুগে তা আমাদের জাতীয় জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এই পরিচয়পত্র অন্তত ১১টি সরকারি-বেসরকারি সেবার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োজন ছাড়াও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। বস্তুত জন্মনিবন্ধনের সময় থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা এর প্রাথমিক নম্বর যদি নিশ্চিত করা যেত, তাহলে অনেক জটিলতা এড়ানো সহজ হতো। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ যে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে কিংবা প্রতিবেশী দেশ থেকে কোনো কোনো বাংলাভাষী নাগরিককে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্তের এপাশে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে, সেই সুযোগ থাকত না। অবশ্য স্বীকার করতে হবে যে, জালিয়াতি ঠেকানো না গেলে জন্মনিবন্ধনের সময় প্রাথমিক একটি নম্বর বা পরিচয়পত্র দিয়েও কোনো লাভ নেই। আমরা দেখছি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বাংলাদেশে এসে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক মহল ও মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে 'ম্যানেজ' করে জন্মনিবন্ধন সনদ, নাগরিকত্ব সনদ সংগ্রহ করে প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং তার মাধ্যমে পাসপোর্ট বাগিয়ে নিয়েছে। অনেকে শেষ পর্যায়ে ধরা পড়লেও আরও অনেকে নির্বিঘ্নে সব ধাপ যে পার হয়ে গেছে, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ সামান্য। গত বছর ধরা পড়া এক জালিয়াত চক্র থেকে জানা গিয়েছিল, শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলেই প্রায় চার হাজর রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েছিল তারা। আমাদের আশঙ্কা, এমন চক্র আরও রয়েছে এবং তারাও এভাবে হাজার হাজার জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করেছে। দুর্ভাগ্যবশত এসব মামলা যেমন দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়েছে, তেমনই জালিয়াতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদ্ঘাটনের উদ্যোগও হারিয়েছে গতি। এর মধ্যে আমরা দেখলাম, বহুল আলোচিত প্রতারক মোহাম্মদ সাহেদ বা সাহেদ করিম আগের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতেও নতুন আরেকটি 'আসল' জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে, জালিয়াতির সুযোগ যে কেউই নিতে পারে। আমরা মনে করি, জাতীয় পরিচয়পত্রের আওতা সম্প্রসারণের আগে এসব ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রমাণ দিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত এ ব্যাপারে কার্যক্ষেত্রে যেমন অদক্ষতা তেমনই অবহেলাই দেখা যায়। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে সদর্থক ভূমিকা নিতে হবে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের সামান্য লাভের বিপরীতে জাতীয়ভাবে কতটা ক্ষতি হতে পারে, সেই দিকটা সম্পর্কে তাদের সচেতন ও সতর্ক করতে হবে। সবচয়ে বেশি জরুরি জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যে কোনো অনিয়ম ও জালিয়াতির ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা ও সর্বোচ্চ শাস্তি। তাতে করে জালিয়াতির হার নিশ্চয়ই কমে আসবে। আমরা প্রতিকারের চাকা যদি দীর্ঘসূত্রতার কাদায় আটকে যায়, তাহলে এ ধরনের অঘটন ঘটতেই থাকবে। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, পরিমার্জন ও হালনাগাদের অনলাইন সেবা সম্প্রসারণের যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, সেটাকেও স্বাগত জানাতে আমাদের দ্বিধা নেই। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নটি সর্বাগ্রে। বাড়ির পশ্চাৎ ফটক অবারিত রেখে সদর দরজায় যত খিলই আঁটা হোক না কেন, তা বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোই প্রতিপন্ন হবে।

আরও পড়ুন

×