আমলাতন্ত্র
কর্মের কর্তা, না শুধুই কর্তা
ইকরাম কবীর
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১৬:০৭
খবরে বেরিয়েছে যে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক হাজার কর্মকর্তা খিচুড়ি রান্না, রান্না ব্যবস্থাপনা এবং সেই খিচুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিতরণের ব্যবস্থাপনা শিখতে বিদেশে যেতে চেয়েছেন। এটি আমাদের স্কুল ফিডিং প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রকল্পে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের খিচুড়ি খাওয়ানো হবে এবং কর্মকর্তারা কেমন করে কেনাকাটা করতে হয়, একসঙ্গে অনেক খাবার রাঁধতে হয় এবং কেমন করে তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হয়- এসব শিখতে যাবেন। এই শিক্ষাসফরের জন্য পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যম আরও বলেছে, আমাদের গণপাঠাগার অধিদপ্তরের ত্রিশজন কর্মকর্তা বিদেশে যাবেন তাদের নতুন প্রধান শাখার ভবনটি কেমন করে তৈরি করবেন তা শিখতে। এর আগে আমরা দেখেছি কর্মকর্তারা আরও অনেক কাজ শিখতে বিদেশে যেতে চেয়েছেন। যেমন-
গরু লালন-পালন, পুকুর ও কূপ খনন, ফল চাষ, ট্যাংরা মাছ চাষ ইত্যাদি।
এবার শুনছি দেশের বাইরে নয়। ভেতরেই ঘুরবেন তারা। বাইরে তো ইলিশ নেই। ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা শিখতে ১৭৪ জন কর্তা দেশের ভেতরেই ভ্রমণ করবেন। খরচ হবে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা, যা জনপ্রতি খরচ চার লাখ এক হাজার ৭২৫ টাকা। দেশের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার চেয়ে দেশের ভেতরেই ভ্রমণ ব্যয় বেশি মনে হচ্ছে না? ইংরেজি 'স্কোয়ান্ডার' শব্দের সঙ্গে অনেক মিল পাওয়া যাচ্ছে।
আমরা যারা আমজনতা, তারা চিরকালই শুনে এসেছি কর্মকর্তারা নাকি জনতার জন্য কাজ করেন। আমাদের বুদ্ধি কম মনে হতে পারে। অন্তত যারা আমাদের ভালো থাকার জন্য কাজ করেন, তাদের চেয়ে তো কম। কিন্তু খিচুড়ি রান্না-ব্যবস্থাপনা-বিতরণ শিখতে বিদেশে কেন যেতে হবে তা আমাদের এই কমবুদ্ধির মস্তিস্কে ঢুকছে না। যেসব কাজ আমাদের বাপ-দাদা-মায়েরা হাজার বছর ধরে করে এসেছেন, তা শিখতে আমাদের পাস করা কর্তাদের
বিদেশ যেতে হবে, তা চিন্তা করলেই ব্যাপারটি বেশ হাস্যকর মনে হচ্ছে।
দেশের ভেতরে কি এসব শিক্ষার ব্যবস্থা নেই? খাদ্যপুষ্টির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে; ব্যবস্থাপনা-বিতরণ শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আছে। যে দেশে তারা এসব শিক্ষা নিতে যেতে চাচ্ছেন, সেসব দেশের মানুষ কোন দেশে গিয়ে সেই শিক্ষা নিয়েছিল?
আমাদের বাদামওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, চানাচুরওয়ালা, ফুটপাতের হকার, ভিখারি ছেলেমেয়েগুলো- এদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন? আপনারা যা শিখতে বিদেশ যেতে চান, তা এরা এমনিই তা যানেন। যেসব জাদু-ব্যবস্থাপনা শিখতে আমাদের মতো মানুষদের 'বিজনেস ফ্যাকাল্টি'তে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে হয়, তা আমাদের গরিব 'ওয়ালা'রা দু'সপ্তাহে নিজেরাই শিখে নেন।
চিন্তা করে দেখুন! আমাদের বাদামওয়ালারা তাদের প্রকিউরমেন্ট, বিক্রি, এস্টাব্লিশমেন্ট খরচ, কাস্টমার স্যাটিসফেকশন, প্রফিট, 'হাউ মাচ প্রফিট ইজ এনাফ' এগুলো কোথা থেকে শেখেন? বিদেশে গিয়ে? অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের ফুটপাতের বিক্রেতারা যা শিখে ফেলেন তা শিখতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও আইবিএ-পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের কয়েক বছর লেগে যায়। ব্যবস্থাপনা ও বিতরণ-ব্যবস্থা যদি বিদেশে গিয়েই শিখতে হয়, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয়তা কতটা? আমরা সেখানে পড়াশোনাই বা কেন করি?
সারাদেশে অনেক খাবার প্রস্তুতকারী কোম্পানি আছে যারা দিনের পর দিন সব বিয়েবাড়ি ও কমিউনিটি সেন্টারে খাবার সরবরাহ করে যাচ্ছে। এরা তাদের রান্না এবং বিতরণ-ব্যবস্থা কোথা থেকে শিখেছে?
কোনো এক অজুহাতে বা জনসাধারণের জন্য কষ্ট করে কাজ করার পুরস্কার হিসেবে কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করবেন, সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের এক নীরব সম্মতি আছে বলে মনে হয়। থাকতেই পারে। অনেক কাজ করার পর কোথাও গিয়ে আরাম ও বিনোদন করার ব্যবস্থা থাকতেই পারে। সেটি উল্লেখ করে প্রকল্প প্রস্তাবে বলে দিলেই আর কোনো প্রশ্ন ওঠে না। প্রশিক্ষণ নিয়ে এমন নাটক সাজানোর কোনো প্রয়োজন হয় না।
তেমন ব্যবস্থা থাকলেও, কর্মকর্তাদের আরাম-আয়েশ নিয়ে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। দেশে করদাতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে যারা কর দিয়ে বসবাস করেন, তাদের প্রতিজন করদাতার সিদ্ধ অধিকার আছে কর্মকর্তারা কী কাজ করছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ কেমন করে খরচ হচ্ছে এবং কাজে কোনো ভুল হচ্ছে কিনা তা নিয়ে কথা বলার। বিষয়টি আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েই কাজ করতে হবে।
আমাদের কর্তৃপক্ষ এবং আমরা সাধারণ মানুষ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে উদ্বিগ্ন। অর্থনীতি নিয়ে, নিজেদের উপার্জন নিয়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই বলেছেন, সব ক্ষেত্রেই আমাদের খরচ কমাতে হবে। বেসরকারি খাতেও তাই হচ্ছে। যথাসম্ভব খরচ কমানো হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় সম্পদ যারা রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাদের মধ্যে এমন চিন্তা লক্ষ্য করছি না। লাখ লাখ মানুষের কাজ ছিল না, হাজার-হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এসব মানুষ কর্মকর্তাদের পানে চেয়ে থাকেন সাহায্যের জন্য। তাদের জন্য খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য। কর্মকর্তারা দেশের অর্থ বাঁচিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন, যা জনমানুষের কাজে লাগবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবতা ভিন্ন। কর্মকর্তারা তাদের অবস্থানের সুযোগ নিয়ে দেশের অর্থ অপব্যয় করেন। তারা দেশের মানুষকে তাদের সেবক মনে করেন। কিন্তু আপনারা তো এখন আর ঔপনিবেশিক বাবু নন। দেশ স্বাধীন হয়েছে। বিলেতি-পাকিস্তানিরা চলে গেছে। আপনারা মানুষের কর্তা নন, কর্মের কর্তা। আপনাদের ভাবতে শিখতে হবে যে, জনমানুষ আপনাদের গ্রাহক। তাদের জীবন সহজ করার জন্য আপনাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা আপনাদেরই তৈরি করে দিতে হবে।
আমরা অনেকেই বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করি, যেখানে লাখো-কোটি গ্রাহককে সেবা দিতে হয়। আমরা আমাদের গ্রাহকদের স্যার এবং ম্যাডাম বলে সম্বোধন করি। অথচ আপনারা জনগণকে শিখিয়েছেন আপনাদের স্যার-ম্যাডাম বলে ডাকতে। আপনারাই তো জনমানুষকে স্যার-ম্যাডাম বলবেন- তারা আপনাদের গ্রাহক। জনগণকে বোকা ও শক্তিহীন মনে হলেও তাদের চিন্তাশক্তি আছে। তারা আপনাদের চালাকি বোঝেন। একটু খেয়াল করে দেখলেই বুঝবেন, আপনারা মানুষের বিশ্বাস হারিয়েছেন। এমন জীবন কি আপনাদের ভালো লাগে?
গল্পকার ও যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত
- বিষয় :
- আমলাতন্ত্র
- ইকরাম কবীর
