পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু
একটি হত্যা, অনেক দায়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০
অপচিকিৎসার নামে রোগীর শারীরিক অবনতি এমনকি প্রাণহানিও আমাদের দেশে বিরল নয়। কিন্তু রাজধানীর একটি হাসপাতালে 'চিকিৎসা' নিতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমের মৃত্যু যেভাবে হয়েছে, তা যেন অতীতের নিকৃষ্টতম নজিরকেও হার মানিয়েছে। এটা 'চিকিৎসা' তো নয়ই, অপচিকিৎসাও নয়; হত্যাকাণ্ড মাত্র। এটা স্পষ্ট যে, আদাবরের 'মাইন্ড এইড' নামে কথিত বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে তাকে কার্যত পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৮-১০ জন মিলে তাকে হত্যা করার যে চিত্র সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে, তা যেন হরর সিনেমা। একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষকে কেউ এভাবে নির্বিচারে আঘাত করতে পারে! পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিমের প্রাণহানির পর সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যেসব তথ্য ও সাক্ষ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে, তিনি হাসপাতালটিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেননি। বস্তুত গত ৭ নভেম্বরেও তিনি বরিশাল মেট্রোপলিটান পুলিশে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন।
বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিস্মিতও হই এটা ভেবে যে, একজন দৃশ্যত শান্ত রোগীকে এভাবে দলবেঁধে ধরে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে হত্যার কী কারণ থাকতে পারে? আমরা মনে করি, এর উত্তর রয়েছে হাসপাতালের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির সদর ও অন্দরে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, এখানে যারা 'দায়িত্ব' পালন করতেন, তাদের কেউই মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন না। নেহাত হাতুড়ে মাত্র। এমনকি সেখানে সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও থাকতেন না। আরও ক্ষোভ ও হতাশার বিষয়, খোদ হাসপাতালটিরই মানসিক চিকিৎসা বিষয়ক অনুমোদন নেই। এমন একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠানের অচিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারী যা করতে পারে, সোমবার সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাই ঘটেছে। এখন প্রাথমিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে, চিকিৎসার নামে সেখানে কীভবে রীতিমতো 'টর্চার সেল' খোলা হয়েছিল! বাতাস চলাচলের অনুপযোগী অন্ধকূপ সদৃশ একটি কক্ষে নতুন বা পুরোনো চিকিৎসাপ্রার্থীদের কপালে নির্মম নির্যাতন ও নিঃসঙ্গতা জুটত। এখন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এসব অনিয়ম, অমানবিকতা ও অপচিকিৎসার বিষয় সামনে আসছে। আমরা আশঙ্কা করি, আগেও সেখানে এভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু অঘটনের শিকার ব্যক্তির স্বজনরা আলোচ্য কর্মকর্তার পরিবারের মতো সচেতন ও সক্রিয় না হওয়ার কারণে হয়তো নীরবেই ওইসব ঘটনাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। আমরা মনে করি, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের উপযুক্ত জিজ্ঞাসাবাদ করলে অতীতের আরও প্রাণহানির ঘটনা উদ্ঘাটন হতে পারে। কথিত হাসপাতালটিতে যারা আগেও চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদেরও উচিত হবে পুরোনো চিত্র খতিয়ে দেখা এবং ক্ষতিপূরণ চাওয়া। আমরা মনে করি, সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগও এই মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না।
অনুমোদন ছাড়া একটি তিনতলা হাসপাতাল রাজধানীর বুকে কীভাবে এতদিন সাড়ম্বরে অনিয়ম চালিয়ে গেল, তার জবাবদিহি তাদের করতেই হবে। বিশেষত আলোচ্য পুলিশ কর্মকর্তা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কথিত বেসরকারি হাসপাতালটির দালালরা যেভাবে তাকে নিজেদের ডেরায় নিয়ে যেতে পেরেছে, তা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। এমন ঘটনা যে মানসিক চিকিৎসার সরকারি কেন্দ্রগুলোতে প্রায়শই ঘটে থাকে, তা সহজেই অনুমেয়। আগেই এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে, এই মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়তো হতো না। আমরা দেখতে চাই, অবিলম্বে মানসিকসহ অননুমোদিত সব ধরনের চিকিৎসালয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। মানসিক চিকিৎসা ও মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে এই নৈরাজ্য ও নির্যাতন আর চলতে দেওয়া যায় না। যাদের দায়িত্বে অবহেলা ও ঔদাসীন্যের কারণে সারাদেশে এমন নিরাময় কেন্দ্র ও চিকিৎসালয় গড়ে উঠেছে, তাদেরও আনতে হবে শাস্তির আওতায়। তবে সবকিছুর আগে প্রয়োজন আলোচ্য পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তাহলে ভবিষ্যতে আরও কিছু মূল্যবান প্রাণ বেঁচে যাবে এবং চিকিৎসার নামে অমানবিকতার শিকার হবে না। কারও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর কিছুদিন হৈচৈ এবং তারপর সব আগের মতোই চলতে থাকার যে চিত্র আমরা দেখে থাকি; এক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি হবে আত্মঘাতী।
- বিষয় :
- পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু