ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

অর্থনীতি

একবিংশ শতাব্দীর কর্ম ও জীবন

একবিংশ শতাব্দীর কর্ম ও জীবন
×
×

ড. মাহবুব উল্লাহ

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২০ | ১৫:০৯

আমাদের এ পৃথিবী একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক অতিক্রম করতে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন আসবে বলে দার্শনিক ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা মনে করেন। একবিংশ শতাব্দীতে কর্মসংস্থানের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কম্পিউটার এবং রোবটের যে পরিমাণ উন্নতি হয়েছে, তা থেকে অনেকেই ভাবছেন এই শতাব্দীতে মানুষের কাজের ধারা অনেক বদলে যাবে। আমাদের ভাবতে হচ্ছে স্বাধীন কাজের বিকাশ নিয়ে এবং একই সঙ্গে বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ে। এখনও স্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না এই শতাব্দীতে কর্মসংগঠন অথবা কাজের ভবিষ্যৎ কীরূপ হবে। এতদ্‌সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা এসব ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশের কৃষিতে এখনও পারিবারিক শ্রম ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়। পারিবারিক খামারের প্রধান ব্যক্তি হলেন পরিবারপ্রধান। প্রয়োজন হলে বিশেষ করে চারা রোপণ ও ধান কাটার মৌসুমে অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের গ্রামে কৃষি শ্রমিকদের নানা নামে অভিহিত করা হয় যেমন- কামলা, বদলা, মজুর ইত্যাদি। নিজের কাজ নিজে করাকে স্বাধীন কাজ বলে মনে করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশার লোকেরা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ছিল এবং এখনও আছে। তাদের মালিকানায় কাজের হাতিয়াও থাকে। অস্থায়ী কর্মজীবীদের মধ্যে রয়েছে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী এবং কনসালট্যান্টরা। তারা কোনো সুনির্দিষ্ট মালিকের জন্য কাজ করেন না। দেখা যায় এক মালিকের কাজ শেষ হলে তারা অন্য মালিকের কাজ করে। আবার কখনও কখনও একসঙ্গে একাধিক মালিকের কাজ করে। আজকাল কাজের ফলে যে মজুরি বা আয় হয় সেটিও ব্যাপকতর হয়েছে। স্কুলশিক্ষকরা তাদের নিজের বাড়িতে ছাত্রছাত্রীদের টিউটর হিসেবে পড়ান। আবার এটাও লক্ষ্য করা যায়, শিক্ষার্থীরা খণ্ডকালীন কর্মে নিয়োজিত আছে।

অর্থনীতি শাস্ত্র কাজ কীভাবে সংগঠিত হয় তার ভালো-মন্দ নিয়ে বিবেচনা করে না। কাজের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো পছন্দসই কাজ পাওয়া যাচ্ছে কিনা। অর্থাৎ, যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে কাজের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কিনা। কিছু মানুষ আছে যারা মাস শেষে নিয়মিত বেতন পাওয়া যায় এমন ধরনের চাকরি পছন্দ করেন। এর একটা বড় কারণ হলো, এসব চাকরিতে নিরাপত্তা আছে। একটি সংস্থা বা সংগঠনের কর্মী হিসেবে তারা এক ধরনের তৃপ্তি পান। হতে পারে সংস্থা বা সংগঠনটি অন্য কেউ পরিচালনা করছে। তারা কেউ কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভয় পান। এ রকম ব্যক্তিরা তাদের অফিসের এক বা একাধিক অংশে অন্যদের কাজ করার সুযোগ দেন। এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেমন : ফ্যাবল্যাবস (ফেব্রিকেশন ল্যাবরেটরিজ) অথবা মেকারস্পেস। ঢাকা শহরেই বেশকিছু জায়গায় কম্পিউটার মেরামত করা এবং কম্পিউটার ও এক্সেসরিজের বিরাট বাজার রয়েছে। সেখানে সব ব্যবসায়ী কমবেশি কম্পিউটার-সংশ্নিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কম্পিউটারের হাইটেকের উদ্যোক্তা। কেন তারা এক জায়গায় সমবেত হয়ে কাজ করে? এর মূল্য উদ্দেশ্য হলো ধ্যান-ধারণার অংশীদার হওয়া এবং মানবিক যোগাযোগও বজায় রাখা। অন্য মানুষেরা নিজের কাজ নিজে করে আনন্দ পায়, অর্থাৎ, প্রত্যেকেই রুচিসম্মতভাবে কাজ করতে চায়।

এই শতাব্দীর শুরু থেকে আত্মকর্মসংস্থানের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, মানুষের শ্রম খণ্ডিত হয়ে আরও সূক্ষ্ণ কাজে বিভক্ত হয়ে গেছে। আমরা আরও লক্ষ্য করি, কোনো কর্মচারী অথবা কোনো অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি দিনে কয়েক ঘণ্টা কাজ করে যাতে কিছু আয় করতে পারেন। কাজের সুবিধার্থে বিশ্বজুড়ে নামকরা কোম্পানিগুলো মজার মজার কৌশল অবলম্বন করে। 'আমাজন ফ্ল্যাক্স' অনেক সময় তাদের কোনো কর্মীকে কোনো স্থানে যেতে দেখলে পথিমধ্যে কোনো প্যাকেজ পৌঁছানোর প্রয়োজন হলে তার ওপর দায়িত্বটি চাপিয়ে দেয়। এখানে ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হলো কম দূরত্বের গন্তব্যে প্যাকেজ পৌঁছানোর জন্য ডেলিভারি কোম্পানিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। আমাজন 'মেকানিক্যাল টার্ক' নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কর্মীরা ছোটোখাটো কাজ করে। কারও কারও জন্য এটা 'ফুল টাইম জব'। এখন সারাবিশ্বে পাঁচ লাখ 'টার্কার' আছে। আরও অনেক রকমের 'টার্কার' আছে- যেমন: বাড়ির আগাছা পরিস্কার করার জন্য কর্মী, নতুন ওয়েবসাইট তৈরি করার জন্য কর্মী, ঘর মেরামত করার জন্য কর্মী, অথবা বাড়ি বদলানোর জন্য সহায়তাকারী কর্মী। ঢাকা শহরের দিকে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখন বাড়ির পানির ট্যাঙ্ক পরিস্কার করা, বাড়ি থেকে পোকামাকড় দূর করা কিংবা গৃহকর্মী জোগাড় করা প্রভৃতির জন্য অনানুষ্ঠানিক খাতে প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে।

এগুলো নিয়ে চিন্তা করলে খুব মামুলি ব্যাপার মনে হবে। কিন্তু ডিজিটালাইজেশনের ফলে অনেক উৎপাদনমুখী কাজ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে আরও সহজ-সরল কাজে পরিণত হয়েছে। উৎপাদনের কাজের মতো ব্যবহারকারীদের কাছে কোনো জিনিস পৌঁছানোর কাজও খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সেক্রেটারি অব লেবার রবার্ট রাইখ কর্মজগতে নতুন প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এই চিত্রকে তিনি বলেছেন, টুকরা-টাকরির অংশীদার হওয়া। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কেউ কেউ সেলাই-ফোঁড়াইয়ের অর্থনীতি বলে অভিহিত করেছেন। কাঁথা সেলাই করতে গিয়ে অনেকে পুরোনো কাপড়ের টুকরোর মধ্যে সেলাই করে জোড়া দেয়। ফলে শেষ পর্যন্ত কাঁথা সেলাই হয়ে গেলে একটি প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিস তৈরি হয়ে যায়। ইংরেজি ভাষায় একে বলা হয়ে, 'প্যাচওয়ার্ক ইকোনমি'। রবার্ট রাইখ বলেছেন, নতুন 'সফটওয়্যার' প্রযুক্তি যে কোনো কাজকে টুকরো টুকরো করে বিভক্ত করে ফেলে। বিভক্ত কাজের টুকরোগুলোকে প্রয়োজনবোধে শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট কাজের চাহিদা অনুযায়ী বেতন নির্ধারিত হয়। যারা এই প্রবণতাকে সমর্থন করেন, তাদের দাবি হলো, এর ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাজার দক্ষ হয়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বাজার সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা আছে। অনেকেরই ধারণা, এসব বাজারে সিন্ডিকেশনসহ অনেক সমস্যা আছে। এসব সমস্যা দূর করার জন্য প্রয়োজন মাফিক সফটওয়্যার তৈরি করা যেতে পারে। তবে খুব দ্রুত এই সমাধান কার্যকর করা সম্ভব হবে না। যদি কখনো-বা সম্ভব হয়, তাহলে এটা হবে সবার জন্য 'উইন-উইন' ব্যবস্থা। যারা অবস্থাপন্ন তারা অগণিত সেবাকর্মের জন্য অর্থ ব্যয় করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত। এই অবস্থাটা আগে ছিল না। মধ্যবিত্তরাও এখন যাতায়াতের জন্য উবারের শরণাপন্ন হয়। উবারের জন্য বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করা হয়। উবার তুলনামূলকভাবে ট্যাক্সি সার্ভিস কোম্পানিগুলোর চেয়ে সাশ্রয়ী। লন্ডন-প্যারিসের মতো শহরে ট্যাক্সিতে চলাচল করা খুবই ব্যয়বহুল ছিল। এখন উবার সার্ভিস এই ব্যয়ের মাত্রাকে অনেকখানি নিচে নামিয়ে এনেছে।

একবিংশ শতাব্দীতে কম্পিউটার, সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের ধারণাকে বিশালভাবে বদলে দেবে। হয়তো ৮ ঘণ্টার কাজ ৪ ঘণ্টায় করা যাবে। কিংবা তারও চাইতে কম সময়ে করা সম্ভব হবে। বেশুমার পণ্যসেবা দিতে হবে। মানুষের ভোগের মাত্রা অনেক বেড়ে যাবে। কাজের সময় কমে গেলে বিশ্রামের সময় বাড়বে। এই বিশ্রামের সময়কে মানুষ শিল্প ও ললিতকলা এবং সাহিত্য চর্চার জন্য ব্যবহার করতে পারবে। এই অবস্থায় প্রশ্ন হলো, সমাজব্যবস্থার ধরন কী হবে। আমার কাছে মনে হয়েছে, নতুন ধরনের সমাজতন্ত্রের এ ধরনের উন্নয়নের সুফল ভোগ করা সম্ভব হবে। তবে বহু ধরনের ভোগ্যপণ্য ও সেবা উৎপাদন হলে প্রাকৃতিক পুঁজির ওপর অনেক চাপ পড়বে। এর ফলে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কীভাবে পরিবেশ সহায়ক করা যায়, তা নিয়ে প্রচুর গবেষণা প্রয়োজন আছে।

অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন

×