ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজয়ের মাস

স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতাম

স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতাম
×
×

শিরীন আখতার

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ০৪:২১

আমি হঠাৎ করে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যাইনি। ১৯৭১-এর আগে থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমার পরিবারের অনেকেই সরকারি চাকরি করলেও তারা রাজনীতি সচেতন ছিলেন। বাড়িতে আগে থেকেই রাজনৈতিক চর্চা ছিল। আত্মীয়স্বজনের অনেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতি করতেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলাম। তখন ছাত্রলীগের মধ্যে দুটি অংশ ছিল। একটি অংশ পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে এবং আরেকটি অংশ স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় ছিল। আমরা ছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে সক্রিয় অংশে। সেখান থেকেই আমরা স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর টালবাহানা এবং ক্রমবর্ধমান জুলুম-নির্যাতন-শোষণ আমাদের একটি লড়াইয়ের দিকে ধাবিত করে। আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, আমাদের একটি সশস্ত্র যুদ্ধে লড়াই করতে হবে। অসহযোগ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের দিকটি আরও ত্বরান্ব্বিত হয়। আমরা অসহযোগ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণসহ মুক্তিকামী বাঙালির সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশ নিই। যুদ্ধ অনিবার্য বুঝতে পেরেই আমরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকি। আমার চাচা প্রকৌশলী শফিকুল আনোয়ার অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে যান। ২৮ অক্টোবর গ্রামের রেললাইনের পাশে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খানের ঘোষণায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো। সেদিন আপামর জনতা বিদ্রোহ-ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশে পতাকা উত্তোলন, যা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। ৩ মার্চ ঘোষণা হলো পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার, জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'। এরপর বহুপ্রতীক্ষিত ৭ মার্চ। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ঘটনা, অমর এক কবিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। বাঙালি জাতি পথ খুঁজে পেয়েছিল, সেদিন সকল নির্দেশনা ছিল সেই ভাষণে। তারই ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুতি চলছিল সমগ্র বাংলাদেশে। একদিকে অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা বাংলাদেশে।

আমি পরিবারের সঙ্গে থাকতাম আজিমপুর কলোনিতে। ১৯৭১ সালের মার্চে সেখানে আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে সচেতন করতে থাকি। ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ শেষে বাসায় ফেরার সময় দেখতে পাই ছাত্ররা কিছু কিছু জায়গায় ব্যারিকেড দিয়েছে। দিন শেষে এলো সেই কালরাত। আগুন জ্বলছে পলাশীর রেললাইনের ধারে বস্তিতে, বিদ্রোহ ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, রিকশার ওপর গুলি খেয়ে পড়ে আছে রক্তাক্ত লাশ, দাউদাউ করে জ্বলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। ২৫ মার্চে রাতের শেষ প্রহরে মুহুর্মুহু কামানের গর্জন, শব্দের তাণ্ডব। মনে হচ্ছিল দালানকোঠা সব গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির মতো চলছিল গোলাগুলি, আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছিল চতুর্দিকে। সেই কালরাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাপুরুষের মতো পাশবিক হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। এক রাতের মধ্যেই তারা ঢাকা শহরকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে ফেলে।

২৬ মার্চ সকালে ভেবেছিলাম বাসার বাইরে যাওয়া যাবে। কিন্তু সকালে আমাদের বাসার সামনেই এক ব্যক্তিকে গ্রেনেড চার্জ করে হত্যা করে পাকস্তানি সেনারা। তখন বুঝতে পারি বাইরে বের হওয়ার পরিস্থিতি আর নেই। পরিস্থিতি উত্তাল হলে ২৭ মার্চ কারফিউ জারি করা হয়। এক দিন পর আমরা ঢাকা থেকে বের হয়ে জিঞ্জিরা যাই। জিঞ্জিরায় গিয়ে সেখানকার মানুষের কাছ থেকে যে অভ্যর্থনা পাই তা ভোলার মতো নয়। আমরা যে এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলাম সেখানকার অধিকাংশ মানুষই ছিল হিন্দু। তারা আমাদের মতো আরও অনেককে আশ্রয় দিয়েছিল। একটি ছোট্ট ঘরে আমরা ৪০ জন অবস্থান করেছিলাম। সেখানে আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে পরের দিন ৩০ মার্চ আমরা ঢাকায় ফিরে আসি। তখন পরিচিত একজন এসে বাবাকে বলেন, লালবাগ থানায় আমার নাম চলে গেছে। তারা যে কোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। বাসায় অবস্থান করা অনিরাপদ ভেবে আমরা বছিলা পার হয়ে আটির দিকে যাই। তখন শুনতে পাই- জিঞ্জিরায় যে এলাকায় আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেখানকার অধিকাংশ মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনারা। তাদের বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সাত দিন পর ঢাকায় ফিরে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। পরিকল্পনা করি কী করা যায়। আমরা ভাইবোনেরা মিলে প্রচারপত্র বিলি করার উদ্যোগ নিই। প্রচারপত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণমানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং পাকিস্তানপন্থিদের সাবধান করা হয়। আমরা পোস্টারও তৈরি করে সেগুলো বিভিন্ন দেয়ালে লাগিয়েছিলাম। দু'জন শিল্পী আমাদের পোস্টারে ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। আমরা বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগালে সবাই বুঝতে পারে ঢাকাতেও মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করেছে। এতে সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই ভয় পেয়ে যান। পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়িতে লাল চিঠি দিয়ে আমরা তাদের সাবধান করে দিই। তখন সবাই বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে থাকে।

একপর্যায়ে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় এবং মিত্রবাহিনী পাকিস্তানিদের ওপর হামলা করতে থাকে। এতে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে শূন্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায় পাকিস্তানিরা। যার অংশ হিসেবে ১৪ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিবাহিনী জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে আজিমপুর কলোনিতে প্রবেশ করে। উল্লাসে ফেটে পড়ে বিজয়ী বীর বাঙালি।

সংসদ সদস্য; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)

আরও পড়ুন

×