স্মরণ
মাকসুদুল আলমের স্বপ্নের গবেষণা কেন্দ্রটি...
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৫:২২
আজ সোনালি আঁশের 'স্বপ্নযাত্রী' বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর চিরদিনের জন্য তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। তিনি ছিলেন অনুসন্ধিৎসু এক বিজ্ঞানী, দুর্দান্ত এক দেশপ্রেমী এবং অক্লান্ত এক কর্মবীর। বাংলাদেশে বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্যোক্তা এবং এর কার্যক্রম সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। লক্ষণীয়, ছাত্রজীবনেই তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মাকসুদুল আলম। তার বাবা দলিলউদ্দিন আহমেদ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। মা লিরিয়ান আহমেদ ছিলেন সমাজকর্মী ও শিক্ষিকা। স্বাধীনতার পর উচ্চশিক্ষার জন্য মাকসুদুল আলম রাশিয়ায় চলে যান। ১৯৭৯ সালে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে অণুপ্রাণবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। ১৯৮২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অণুপ্রাণবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। এর পাঁচ বছর পর জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব বায়োকেমিস্ট্রি থেকে প্রাণরসায়নেও পিএইচডি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের 'ম্যানোয়ার ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই'-এর অধীনে কলেজ অব ন্যাচারাল সায়েন্সেসে জিনোমিকস, প্রোটিওমিকস ও বায়োইনফরমেটিকস বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।
'ন্যাচার'সহ পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জার্নালে ড. মাকসুদুল আলমের ৭৮টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ১৯৮৭ সালে জার্মান সায়েন্স ফাউন্ডেশনের 'হাম্বল্ড রিসার্স ফেলো', ১৯৯৭ সালে 'এনআইএইচ স্যানোন অ্যাওয়ার্ড' এবং ২০০১ সালে হাওয়াই ইউনিভার্সিটির 'এক্সিলেন্স অব রিসার্স অ্যাওয়ার্ড' সম্মাননায় ভূষিত হন।
'সোনালি আঁশের বাংলাদেশ' কথাটি হারিয়ে গিয়েছিল সুদূর অতীতে। অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পাটের সেই স্বর্ণময় অতীত ফিরিয়ে আনতে বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে ২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে জেনোম গবেষণার জগতে। তিনি তখন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের জুট জেনোম সিকোয়েন্সিং প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী। তার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডাটাসফটের একদল উদ্যমী গবেষকের যৌথ প্রচেষ্টায় ২০১০ সালে তোষা পাটের জিন নকশা আবিস্কৃত হয়। ২০১০ সালের ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটের জেনোম সিকোয়েন্স আবিস্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেন। পাটের জেনোম কোড বা জন্মরহস্য উন্মোচন কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য। এর ফলে দেশে পাটের উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি এবং পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা এর আগে জেনোমবিষয়ক যাবতীয় তথ্য উন্নত বিশ্বের তথ্যভান্ডার থেকে শুধু সংগ্রহই করেছেন। কিন্তু এখন সে তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতেও অবদান রাখছেন এ দেশের বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে সম্পদের সীমাবদ্ধতায়ও সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা ও লোকবল দিয়ে এ ধরনের সুশৃঙ্খল একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। এ গবেষণার নেতৃত্বে থাকা অধ্যাপক মাকসুদুল আলম এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পেঁপে এবং মালয়েশিয়ায় রাবারের জীবনরহস্য উন্মোচনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ২০১২ সালে তার নেতৃত্বে এক দল গবেষক পাটের জন্য ক্ষতিকর এক ধরনের ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। এর পর পাটের স্বত্ব (পেটেন্ট) নিয়েও দেশি আইনজীবীদের সহায়তায় তিনি কাজ করেছিলেন। বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের আবিস্কার সোনালি পাটের নতুন ভবিষ্যৎ তৈরিতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।
পাটের জেনোম গবেষণা 'স্বপ্নযাত্রা' প্রকল্পের প্রধান গবেষক হিসেবে বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের মাসিক সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ লাখ টাকা। এবং তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল হোটেল শেরাটনে। কিন্তু এর একটি টাকাও নেননি তিনি! থেকেছেন বড় বোনের বাসায়। বিনা পারিশ্রমিকে তিনি কাজ করেছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। সুন্দর মনের এ মানুষটি অভ্যস্ত ছিলেন সাদামাটা জীবন যাপনে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'আমি এই কাজটি টাকার জন্য করছি না। এটি করছি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য।' কাজের ক্ষেত্রে 'পরিচ্ছন্নতাকর্মী' থেকে শুরু করে 'বিজ্ঞানী'- সবার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ ছিলেন তিনি। সবার ঘরের খোঁজ রাখতেন। সবাইকে নিয়ে এক টেবিলে খেতেন। পুরো অফিসে নেমপ্লেট ছিল না কারও। কি পিয়ন, কি কর্মকর্তা; সবার একটাই পরিচয়- দেশের জন্য কাজ করছেন সবাই।
বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম দেশের একটি দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তার নির্যাস আমি আমার মাতৃভূমিতে দিতে চাই। আমি যে গবেষক দল তৈরি করেছি, তাদের নিয়ে আমি আরও নতুন নতুন গবেষণা ও গবেষক তৈরি করতে চাই। সুযোগ ও কাজের পরিবেশ পেলে যে অনেক কিছু সম্ভব, তা আমাদের গবেষকরা প্রমাণ করে দিয়েছেন। এখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এদের নিয়েই আমরা চলুন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। আসুন, দেশকে মায়ের মতোই ভালোবাসি।'
ভীষণ কাজ-পাগল, প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন তিনি। এমন দেশপ্রেমিক বাংলাদেশে খুব বেশি নেই। বর্তমান বাংলাদেশে তার মতো মানুষের বড়ই অভাব।
বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম 'স্বপ্নযাত্রা' প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন এবং বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের সঙ্গে এ প্রকল্পে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের জীবন ও কর্ম নিয়ে আমার সম্পাদনায় একটি গ্রন্থ 'বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম স্মরণগ্রন্থ' প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময়ও ড. মো. মঞ্জুরুল আলম সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন। বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের মৃত্যুর পর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে তার স্মরণসভায় তিনি বলেছিলেন, 'মাকসুদুল আলমের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার দল কাজ করে যাবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশ মাকসুদুল আলম দিয়েছেন।'
দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অতি সম্প্রতি যখন আমি জিনোম বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নের সেই গবেষণা সেন্টারটি কী অবস্থায় আছে জানতে খোঁজ-খবর নিই, তখন এর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সেন্টারটি আগের অবস্থায় নেই। গবেষণা সেন্টারটি নিয়ে বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের যে স্বপ্ন ছিল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল, সেখান থেকে সেটি এখন অনেক দূরে সরে গেছে। কথা ছিল 'স্বপ্নযাত্রা' প্রকল্পটিকে ধীরে ধীরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বাধীন ইনস্টিটিউট হিসেবে দাঁড় করানো হবে। 'স্বপ্নযাত্রা' প্রকল্পটি যখন শুরু হয়, তখন যে ডিপিপি অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্পের ছক পাস হয়েছিল, যেটার ওপর ভিত্তি করে প্রজেক্টটি চলছিল, সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল, এটি হবে একটি 'সেলফ সাসটেইনেবল এনটিটি', যেটা বাংলাদেশের জিনোম গবেষণায় সরকারি-বেসরকারি খাতসহ তৃতীয় বিশ্বের জনগণের জিনোম গবেষণার একটি প্ল্যাটফর্ম হবে। সেখানে এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি গবেষক-তরুণ বিজ্ঞানীরা কাজ করার সুযোগ পাবেন। সে লক্ষ্যে আইনের খসড়াও প্রণয়ন করা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ কৃষি মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, 'গবেষণা সেন্টার'টি আলাদা কোনো স্বাধীন ইনস্টিটিউট হবে না; পাট গবেষণা কেন্দ্রের অধীনে জিনোম রিসার্চ উইং হিসেবে থাকবে। এভাবে যদি 'গবেষণা কেন্দ্র'টির স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তাহলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না এবং তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীরা কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। তিনি চেয়েছিলেন তার হাতে গড়া 'গবেষণা সেন্টার'টি স্বাধীন ইনস্টিটিউট হিসেবে কাজ করবে, যেখানে বাংলাদেশের নবীন গবেষক ও বিজ্ঞানীরা কাজ করার সুযোগ পাবেন। যদি সেটি না করা যায়, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের স্বপ্নের ব্যত্যয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম এই গবেষণা সেন্টারটি গড়ে তুলেছিলেন শুধু পাটের জিনোম আবিস্কারের জন্য নয়। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এবং কাজ শুরু করেছিলেন অন্যান্য শস্যেরও জিনোম আবিস্কারে। কাজেই এ গবেষণা কেন্দ্রটি শুধু পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের অংশ হয়ে কেন থাকবে? এটি একটি স্বাধীন ইনস্টিটিউট হয়ে না উঠলে দেশের নবীন ও মেধাবী গবেষকরা এখানে কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। আশা করছি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, কৃষি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং গবেষণা সেন্টারটিকে স্বাধীন ইনস্টিটিউট হিসেবে গড়ে তুলবে।
কবি, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী
- বিষয় :
- স্মরণ
- শাহেদ কায়েস
- মাকসুদুল আলম