ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার: রেজাউল করিম চৌধুরী

প্রতিশ্রুতি নয়, আমি কাজে বিশ্বাসী

প্রতিশ্রুতি নয়, আমি কাজে বিশ্বাসী
×

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সারোয়ার সুমন

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:৪১

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক। তিনি ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন।

সমকাল: বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হলেন। আপনার ধারণা কি ছিল?

রেজাউল করিম: এ শহরের আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠেছি আমি। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্ত আছি রাজনীতিতে। আবার ভোটকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের কাছাকাছি গেছি। উন্নয়নের পক্ষে গণজোয়ার দেখেছি। নগরবাসী তাদের দেওয়া কথা রেখেছেন। উন্নয়নের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম সব সময়। কত ভোটের ব্যবধানে জিতেছি- সেটা আমার কাছে মুখ্য নয়। নগরবাসী আমাকে সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন- শুধু এটিই ভাবতে চাই।

সমকাল: নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করেছে বলে অভিযোগ দিয়েছেন আপনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোট ডাকাতির কথাও বলছেন তারা?

রেজাউল করিম: বিএনপির অভিযোগ নিয়ে আমি বেশি কিছু বলতে চাই না। শুরু থেকেই তারা নানা অজুহাত দিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছে। জনগণের রায়ে যদি এত সন্দেহ থাকে, তবে নির্বাচনে কেন এলো তারা? কেন মানুষের কাছে গিয়ে ভোট চাওয়ার প্রহসন করল?

সমকাল: নির্বাচনে ভোটের হার মাত্র সাড়ে ২২ শতাংশ। এত কম ভোট অতীতের কোনো নির্বাচনে তো ছিল না। কেন এমন হলো?

রেজাউল করিম: কর্মজীবী মানুষ ভোটের চেয়ে কাজকে বেশি প্রাধান্য দেন। সরকারি ছুটি না থাকার কারণেও কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে শতভাগ কিংবা ৯০ শতাংশ ভোট পড়ে। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। সবচেয়ে বড় সফলতা এটিই।

সমকাল: আপনাকে মনোনয়ন দিয়ে বড় ধরনের চমক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আবার বড় জয় দিয়ে আপনিও চমকে দিলেন সবাইকে। কীভাবে ম্যানেজ করলেন সব?

রেজাউল করিম: দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি। তা বিবেচনায় নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। জয়ী হয়ে আমি তার প্রতিদান দিতে পেরেছি। এই বিজয় আমার নয়; চট্টগ্রামবাসীর। এ বিজয় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এটা সত্যি যে, আওয়ামী লীগে এবার অনেক যোগ্য প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু আমার ওপরেই আস্থা রাখলেন প্রধানমন্ত্রী। জননেত্রীর এ সিদ্ধান্ত সাদরে মেনে নিয়েছেন সবাই। আমি সবার কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছি। দলের জন্য সবাই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। এ কারণে এসেছে বিপুল ভোটের বিজয়।

সমকাল: কোন কাজ কখনোই করবেন না?

রেজাউল করিম: অন্যায়-অনৈতিক কাজে কখনও ক্ষমতাকে ব্যবহার করব না। সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করব আমৃত্যু। নগরবাসীর প্রতিশ্রুতি পূরণে কঠোর পরিশ্রম করব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোনো লোভ-লালসা আমাকে ছুঁতে পারেনি। এবারও লোভ-অনৈতিকতা আমাকে এক ইঞ্চি বিচ্যুতি ঘটাতে পারবে না। কখনও আমি নীতি বিসর্জন দিইনি। এমন ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। স্বকীয়তা নিয়ে নগরবাসীর উন্নয়নে কাজ করে যাব।

সমকাল: নগর উন্নয়নে ৩৭ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কীভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করবেন?

রেজাউল করিম: ৩৭ দফা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির মধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যানজট সমস্যা থেকে উত্তরণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নালা-নর্দমা, খাল-নদী থেকে দখলদার উচ্ছেদ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। চট্টগ্রামকে পর্যটন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, হোল্ডিং ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে রাখা, সমন্ব্বয়কের ভূমিকা পালন করে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প গতিশীল রাখা ও করপোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা হবে। অঙ্গীকারের স্বপ্নের কাচ্চি বিরিয়ানি নয়; নগরের বিপুল জনগোষ্ঠীকে নূ্যনতম সেবা দিতে পারাটাই আসল যোগ্যতা। সবার সহযোগিতা পেলে যোগ্যতার পরীক্ষায় জিতব বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি।

সমকাল: গৃহকর নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক আছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ভর্তুকি নিয়ে কিছু ভাবছেন?

রেজাউল করিম: গৃহকর নিয়ে বিতর্ক এড়াতে ডিজিটাল গৃহশুমারি করা হবে। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেভাবে যৌক্তিক হারে গৃহকর নির্ধারণ করা হবে। নাগরিক সেবা চালু রাখতে করদাতাদের স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতাও পূর্বশর্ত। অপরিকল্পিত স্থাপনা তৈরি, সড়ক ও ফুটপাত দখল কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে। স্বল্প খরচে শিক্ষার মানসম্মত বিকাশে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নগরীর ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং করপোরেট গ্রুপগুলোকে যুক্ত করার ইচ্ছা হয়েছে। আর্থিক সহায়তা পেলে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মেডিকেল কলেজ ও পাঁচশ শয্যার হাসপাতাল চালু করার ইচ্ছা আছে আমার। এ ছাড়া পর্যটন সুবিধা কাজে লাগিয়ে ও সৈকত পর্যটনের আধুনিক সুবিধা যোগ করে নগর উন্নয়নে বাড়তি আয়ের ওপরেও জোর দেব। এ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেম ও নিরাপদ পথচারী পারাপারে আন্ডারপাস চালু করতে চাই। যানজট নিরসনে সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বসে যত দ্রুত সম্ভব তা দূর করার দিকে মনোযোগ দেব। সিটি করপোরেশনের সব কার্যক্রমকে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে নগরীর সব উন্নয়ন ও সেবা খাতকে এক ছাতার নিচে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।

সমকাল: বর্জ্য অপসারণে নজরদারি বাড়ানো হবে?

রেজাউল করিম: অবশ্যই। বর্জ্য অপসারণে আগের চেয়ে বহু গুণে নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের ডাম্পিং ইয়ার্ড করে রিসাইক্লিং প্লান্ট তৈরি করব। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দুটি ডাম্পিং স্টেশনকে আধুনিকায়ন করা হবে। ৪১টি ওয়ার্ডে বর্জ্য অপসারণে গতি বাড়ানো হবে। সব মিলিয়ে একটি সুন্দর শহর উপহার দেওয়া হবে।

সমকাল: দায়িত্ব নিয়ে কোন প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করবেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে?

রেজাউল করিম: প্রতিশ্রুতি নয়, কাজে বিশ্বাসী আমি। নগরবাসীর ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমি কাজ দিয়ে। চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত একটি নগর হিসেবে গড়ে তোলাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন কিছু করার ইচ্ছা আছে। নগরীকে যানজটমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। স্বাস্থ্য খাতে আনতে চাই আমূল পরিবর্তন। আবার জলাবদ্ধতার কারণে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি দূর করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী এটির জন্য যেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছেন, সেগুলোর মান যথাযথভাবে রাখার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। ১০০ দিনের একটি অগ্রাধিকার ছক করেছি আমি। নালা-নর্দমা পরিস্কারের বিষয়টি আছে এতে। এটি নিয়ে কাজ করব সবার আগে। গৃহকর যাতে নগরবাসীর মাথাব্যথার কারণ না হয়, সে জন্য সজাগ থাকব। আবার করপোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার দিকেও রাখতে হবে নজর।

সমকাল: জলাবদ্ধতা নিয়ে আপনি দৃশ্যমান কিছু করবেন- এমনই প্রত্যাশা নগরবাসীর। আপনার ভাবনা কী?

রেজাউল করিম: দেখুন, আমি নিজেও জলাবদ্ধতার শিকার। চলমান ছয় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। অনেক খাল দখল হয়ে গেছে। সেগুলো উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেব। ৪১টি ওয়ার্ডকে ঘিরেই আমি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। আমি সবার মতামত নেব। একজন রিকশাওয়ালার মতামতও আমার কাছে মূল্যবান। নগরের উন্নয়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করব।

সমকাল: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রেজাউল করিম: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

আরও পড়ুন

×