ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অধিকার

মানবাধিকার সংস্থাগুলো কি আমেরিকার 'অস্ত্র'?

মানবাধিকার সংস্থাগুলো কি আমেরিকার 'অস্ত্র'?
×

জাহেদ উর রহমান

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২২ | ১২:০০

পুলিশের এলিট বাহিনী র‌্যাব সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েন নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিল ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। কিছুদিন আগে দেশের সব প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংবাদটি এসেছিল গুরুত্ব দিয়ে। র‌্যাবকে শান্তিরক্ষা মিশনে নিষিদ্ধের দাবি অবশ্য নতুন নয়। গত বছর এবং তার আগের বছরের মানবাধিকার দিবসেও এমন দাবি জানিয়েছিল মানিবাধিকার সংস্থাগুলো। তবে সাম্প্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারকার আহ্বানের আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
বিবৃতি দেওয়া সংস্থাগুলোর মধ্যে দুটি সংস্থা আমাদের দেশে বেশ পরিচিত- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এগুলো পরিচিত কারণ, এরা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, বিবৃতি দিয়েছে। মজার ব্যাপার, এ দুটি সংস্থা আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এমন কিছু কখনও বলেনি, যা আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেনি।
আগে যখনই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নানা ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছিল, তখন বলাই বাহুল্য, সরকার সেটা অস্বীকার করেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্য এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এদের পশ্চিমা পরিচয় সরকারকে এদের বিরুদ্ধে এক নতুন বয়ান তৈরিতে সাহায্য করেছে। প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেন, এই মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন দেশকে শায়েস্তা করার জন্য আমেরিকাসহ পশ্চিমা পৃথিবীর অস্ত্র। তাদের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ- এ রকম আমেরিকা বা অন্য ইউরোপীয় দেশগুলো অন্য কোনো দেশকে যদি চাপ প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে এসব মানবাধিকার সংস্থা দিয়ে কোনো রিপোর্ট করানো হয়। তারপর সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে সেই সরকারকে চাপে ফেলা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে এমন যাচ্ছেতাই নয়, সেটা সরকারের না জানার কথা নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার পরিস্থিতির সমস্যা এবং ক্রমাবনতি নিয়ে সরকারকে যখন প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়, তখন সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নাকচ করে দিয়ে নিজে বাঁচতে চায়। যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির রিপোর্ট আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময়ে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে ঘায়েল করার কাজে ব্যবহার করেছিল; সেই টিআই এখন ক্ষমতাসীনদের তীব্র আক্রমণের শিকার।
দেখা যাক, আমাদের পরিচিত দুই পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থা পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকার মানবাধিকার সম্পর্কে কী বলছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতি বছর একটি রিপোর্ট দেয়। ২০২০ সালের (তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প) আমেরিকার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্টের শুরুতে একটি সারাংশ আছে। সারাংশের প্রথম বাক্যটির বাংলা অনুবাদ এ রকম- 'দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিপর্যয়কর মানবাধিকার রেকর্ড আগের চেয়ে আরও খারাপ হয়েছে ২০২০ সালে।' সারাংশের পরের অংশে সেখানে করোনায় সরকারি নানা অদক্ষতা এবং অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে এবং তারপর 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলন নিয়ে কথা আছে। যখন প্রতিবাদকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ এবং পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং প্রতিবাদ করতে শুরু করে, তখন সেখানে পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের কঠোর সমালোচনা আছে। সমালোচনা আছে মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ নিয়ে। এ ছাড়া সেখানে সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী (এলজিবিটি) এবং নারীদের ওপর বৈষম্য নিয়ে কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, করোনাকালে অনেক কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের মতো ট্রাম্প প্রশাসনও ইমিগ্র্যান্ট এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ওপরে নিপীড়ন চালিয়েছে।
সারাংশের পর তাতে অনেক উপশিরোনামের মাধ্যমে (যেমন- বৈষম্য, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, সভা-সমাবেশের অধিকার, জীবন এবং নিরাপত্তার অধিকার, নির্যাতন এবং অন্যায় আচরণ ইত্যাদি) বিস্তারিতভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আলোচনা আছে।
ওদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিভিন্ন দেশকে আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়া, ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা এভাবে মহাদেশভিত্তিকভাবে সাজিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে তারা মহাদেশগুলোর সঙ্গে আলাদাভাবে রেখেছে। সেখানে আমেরিকার মানবাধিকারের নানা দিককে ছয়টি (ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা, ইমিগ্রেশন, জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক নীতি, দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক অসমতা, বর্ণবাদ) শ্রেণিতে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়েছে। আমেরিকা নিয়ে সংস্থাটির সম্প্রতি কয়েকটি রিপোর্ট এ রকম- আমেরিকার মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির গতি অত্যন্ত ধীর; ক্যাপিটলে হামলার ক্ষেত্রে মার্কিন বর্ণবাদের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে; নির্যাতনের বিরুদ্ধে কনভেনশনের সিদ্ধান্ত মেনে চলার জন্য বাইডেনকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চিঠি; আমেরিকার ইমিগ্রেশন নীতিতে নতুন ভণ্ডামি; সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (ওয়ার অন টেরর) বন্ধ করা হোক; ৯/১১ সারাবিশ্বে আমেরিকা থেকে বিরাট মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়েছে; আমেরিকার কূটনীতির ওপর গুয়ান্তানামো বে কারাগারের নোংরা ছায়া; গুয়ান্তানামো বে কারাগারে আটকদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি; মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার এখনই সময়; জরায়ুমুখের ক্যান্সারে কালো নারীরাই আনুপাতিকভাবে বেশি মারা যায় ইত্যাদি।
সাম্প্রতিককালের নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের দেশে আমেরিকা তুলনামূলক অনেক বেশি আলোচনায় আছে বলে সে দেশটি সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থা দুটি কী বলছে, সেটি আলোচনা করলাম। একই ধরনের রিপোর্ট আমরা পাব ব্রিটেনসহ পশ্চিমা অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মতো কঠোর পদক্ষেপের অনেক আগে থেকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো একটার পর একটা রিপোর্ট করে বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছে। শুরুতে যেমন বলেছিলাম, সতর্ক করেছিল দেশের ভেতরের মানবাধিকার সংস্থাগুলোও। কিন্তু এ দেশের ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সমস্যা স্বীকার করে; সেটা সমাধানের পথে না গিয়ে সবসময় হাঁটে অস্বীকার করার পথে আর সংস্থাগুলোকে বিশেষায়িত করে নানা ভুল বিশেষণে।
ডা. জাহেদ উর রহমান :শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×