ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমাদের কৃতজ্ঞতা

আমাদের কৃতজ্ঞতা
×

সাহাবুদ্দীন আহমদ। ফাইল ছবি

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২২ | ১৩:০৬ | আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২২ | ১৩:০৬

দেশে রাজনীতির এক ঝোড়ো হাওয়ার ক্রান্তির সময়ে তিনি ত্রাতার বেশে এসেছিলেন। তবে স্বেচ্ছায় নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে তাকে আহ্বান করে আনা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তার ওপর জাতির অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করে দেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করেন, যা চিরকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরিত হবে। বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতি পদাধিকারী দৃঢ়চেতা অথচ অন্তর্মুখী স্বভাবের, শেষজীবনে প্রায় নিভৃতবাসী এই অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব সাহাবুদ্দীন আহমদের জীবনাবসান ঘটল ৯২ বছর বয়সে। তার প্রতি আমাদের অন্তিম অভিবাদন।

কোনোদিন রাজনীতি করেননি, পেশায় প্রথমে প্রশাসক ও পরে বিচার বিভাগে এসে শীর্ষ পদ তথা দেশের প্রধান বিচারপতি হয়ে যিনি কর্তব্যকর্মে আদর্শস্থানীয় হয়ে উঠেছিলেন, তার ডাক পড়ল শাসক হিসেবে দুরূহ এক রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের। প্রথমে মাত্র ১০ মাসের জন্য। সে ১৯৯০-৯১ সাল। আহ্বান এসেছিল বিভিন্ন মতাদর্শ ও কর্মসূচির ২৫টির অধিক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে। এ-ও এক নজিরবিহীন ঘটনা দেশের ইতিহাসে। জনসাধারণের ইচ্ছা দ্বারা চালিত রাজনৈতিক ঐকমত্য ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দ্বারা বড় অর্জনের অক্ষয় দৃষ্টান্ত। আজ এরূপ অঙ্গীকারের নিদারুণ অভাব দেশে।

দেশের মানুষ অটুট ঐক্য, অপরিমিত সাহসিকতা ও ত্যাগের বিনিময়ে যুদ্ধজয়ী হয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল যেসব আকাঙ্ক্ষায়, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল গণতন্ত্র। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছর পরে স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের শত্রুদের চক্রান্তে নিহত হওয়ার পরে গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সামরিক ও আধাসামরিক একাধিক স্বৈরশাসক গণতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ওপর তাণ্ডব-নৃত্য করে। রাজনৈতিক দলগুলোর তিনটি জোট ১৫-দল, ৭-দল ও ৫-দল নামে যুগপৎ কর্মসূচি দিয়ে সৃজনশীল কায়দায় স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলে। এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে না চেয়ে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার কুমতলব করেছিলেন। সেনা কর্মকর্তারা সায় দেননি। সে সময় কোনোরকম রাজনৈতিক অনৈক্য বা রাজনৈতিক-শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা সৃষ্টি হলে দেশ আরও বিপর্যয়ে পড়তে পারত। তখনকার প্রতিভাবান রাজনীতিবিদরা শাসনতন্ত্রের ভেতরেই বিদ্যমান রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার থেকে নিরপেক্ষ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রক্তপাত ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ফর্মুলা দেন। তা হচ্ছে স্বৈরশাসক রাষ্ট্রপতি এরশাদ তার নিযুক্ত উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদকে পদত্যাগ করাবেন এবং তিন জোটের মনোনীত ব্যক্তিকে উপরাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ করবেন এবং নিজে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করবেন এবং নতুন উপরাষ্ট্রপতি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের দায়িত্ব নেবেন। তার কাজ হবে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা।

তিন জোটের মনোনীত সেই উপরাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। গররাজি থাকলেও তিনি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক আহ্বানে দেশের ডাকে সাড়া দেন এবং ওই দায়িত্ব পালনের পর আবার প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাবেন বলে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেন। রাজনীতিবিদরাও তার ইচ্ছা পূরণের জন্য সর্বসম্মতভাবে সংবিধান সংশোধন করেছিলেন।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের যোগ্য নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের বদলে সংসদীয় পদ্ধতিতে উত্তরণ ঘটান। তার শাসনক্ষমতায় ওই নির্বাচন অনুষ্ঠান এক ধরনের অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এর ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনকালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং তা থেকে আবার সরে যাওয়ার ঘটনাবলির স্বাক্ষর সমকালীন ইতিহাসে আছে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক আগ্রহে দেশের সর্বজনমান্য ব্যক্তি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করা হয়েছিল। এবার তিনি পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হন। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে ওই দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে অনাকাঙ্ক্ষিত সমালোচনা করা হয়।

নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা ছাড়াও বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির আসনে বসে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সাদাসিধে সরল জীবনযাপন, আড়ম্বরহীনতা, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে মিতব্যয়িতা, ন্যূনতম ব্যক্তিগত ব্যয় নিজে বহন, সময়ানুবর্তিতা প্রভৃতি অনুশীলন করে শাসকদের নৈতিকতার উচ্চ মান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, যা নিয়ে কিংবদন্তির মতো কাহিনি প্রচলিত আছে। যেমন- বঙ্গভবন থেকে আমেরিকায় নিজের ছেলেকে ফোন করার জন্য বিলের কয়েকশ’ টাকা নিজে দিয়েছিলেন। দুঃখজনকভাবে দেশে নৈতিকতার এরূপ মান অবজ্ঞার শিকার হয়েই থাকছে।

গত ৩১ বছর বিভিন্ন আলোড়ন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও ধস্তাধস্তি সত্ত্বেও সংসদীয় পদ্ধতি ও নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠান বজায় আছে। এর ভিত্তি রচনায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের ঐতিহাসিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের মানুষ তা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণে রাখবে।

আর আমরা সাংবাদিকরা অন্য একটি কারণে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের দাবি ও তৎকালীন তিন জোটের রূপরেখার আলোকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একটি কমিটি গঠন করে তার সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাহী আদেশে সংবাদপত্র বন্ধ করার ক্ষমতা রদ করেন এবং দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০১ ধারায় মানহানির ফৌজদারি মামলায় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার না করে আদালতে সমন জারির বিধান করেন অধ্যাদেশবলে। পরে নির্বাচিত সংসদে তা পাস হয়।

তবে এখন সাংবাদিকরা এ অধিকার হারিয়েছেন অন্যভাবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অভিযোগ করলে যখন-তখন সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করার সুযোগ ফিরে এসেছে।

প্রয়াত বিচারপতি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের স্মৃতির প্রতি আমাদের আনত শ্রদ্ধা।

আরও পড়ুন

×