ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইউরোপ

ভ্লাদিমির পুতিন তৈরির পেছনে গণতন্ত্রের 'দায়'

ভ্লাদিমির পুতিন তৈরির পেছনে গণতন্ত্রের 'দায়'
×

জাহেদ উর রহমান

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২২ | ১৪:৩৫

অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি- ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ওপর একটা সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু করবেন। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য না হলেও দেশটি ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা থেকেই যেহেতু এই ভয়ংকর সংকটের শুরু, তাই ন্যাটো শুরু থেকেই এ ব্যাপারে খুব কড়া সতর্কবার্তা দিচ্ছিল। সামরিক শক্তির মাধ্যমে পরস্পরকে ধ্বংস করার কারণে ঝুঁকি তো আছেই, বর্তমান পৃথিবীতে দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে যুক্ত থাকে, সেটা বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে (ডেটারেন্ট) বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু সেই চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করলেন পুতিন।

এবারের সর্বাত্মক যুদ্ধের আগে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করেছিলেন পুতিন। তারও আগে ২০০৮ সালে জর্জিয়ায় আগ্রাসন চালান তিনি। ক্রিমিয়া দখল করার পর বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকার সময় পর্যন্ত রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ থাকলেও ইউরোপ সেটা করতে কুণ্ঠিত ছিল। এর পর রুশভাষীদের মদদ দিয়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দোনবাসে একটি প্রক্সি যুদ্ধ চাপিয়ে দেন পুতিন। তখনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে রাজি হয়নি। সর্বশেষ যখন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রুশভাষী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে একটি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, তখন ইউরোপও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পথে যায়।

রাশিয়ার ওপর তখনকার নিষেধাজ্ঞা অবশ্য খুব কঠোর কিছু ছিল না। অন্যদিকে, অবিশ্বাস্যভাবে সেই যুদ্ধ থামানোর নামে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে মিনস্ক চুক্তি (যা ইউক্রেনের স্বার্থের ঘোর বিরোধী) স্বাক্ষরের জন্য মধ্যস্থতা করে ফ্রান্স ও জার্মানি।

এখন পৃথিবীতে এই আলোচনা খুব জোরেশোরে হচ্ছে, ইউক্রেনের সর্বাত্মক আক্রমণ করার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা যে রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে; যে মাত্রার নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, সেটি ক্রিমিয়া দখলের পর করলে আজকের এই ভয়ংকর সংকটটা আসত না- এটা মোটামুটি নিশ্চিত। ইউরোপীয়রা সেটা করেনি, যদিও তাদের সামনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলারের আচরণের উদাহরণ তো ছিলই।

মোটামুটি খোঁজখবর রাখা মানুষ এখন খুব ভালোভাবেই জানে, রাশিয়ার ওপর ভয়ংকর রকম জ্বালানিনির্ভরতা বর্তমানে ইউরোপকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে বাধা দিয়েছিল। পুতিনের আগ্রাসী চরিত্র খুব ভালোভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালেই; জর্জিয়ায় আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে। তখন থেকেই কি উচিত ছিল না, ইউরোপের রাশিয়ার ওপর জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা? অথচ কমানো দূরে থাক, বাড়িয়েছে সবাই। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ জার্মানি ২০১১ সালে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি দ্বিগুণ করার জন্য বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে (ইউক্রেনকে বাইপাস করার উদ্দেশ্যে) নর্ড স্ট্রিম-২ পাইপলাইন তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়, যা শেষ হয় ২০২১ সালে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের সময় এই পাইপলাইনের কাজ খুব সামান্যই এগিয়েছিল। তাই সেটা বন্ধ করলে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি হতো সামান্যই।

২০০৮ সালের কথা বাদই দিই; ২০১৪ সালের পর থেকে ইউরোপ যদি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি গ্যাসের সংস্থান করতে শুরু করত তাহলে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আমেরিকা থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এনে সেটাকে গ্যাসে পরিণত করে সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত টার্মিনাল এবং অন্যান্য অবকাঠামো ইউরোপেই তৈরি হয়ে যেত। একই সঙ্গে যেহেতু কার্বন কমানো নিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর এক ধরনের চাপ আছে, তাই তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পারমাণবিক বিদ্যুতের ওপর জোর দিতে পারত। তাহলে ২০১৪ সালের পর আট বছরে রাশিয়ার ওপরে জ্বালানিনির্ভরতা নেমে আসতে পারা অনেক নিচুতে।

একবার বিনিয়োগ করে ফেললে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন সমুদ্রপথে পরিবহনের চাইতে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। এতে ইউরোপে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য বা আমেরিকা থেকে আনলে যা ব্যয় হবে তার তুলনায় কম হবে। এটাই সাম্প্রতিক এই ভয়ংকর সংকট হওয়ার পেছনে কাজ করেছে।

গণতন্ত্রের সমালোচনা আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্রশংসা এই- এ ব্যবস্থায় জনগণ মোটা দাগে ক্ষমতায়িত থাকে। তাই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা তা করতে পারে না সরকারগুলো। যেহেতু উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়; যেহেতু সেখানকার কার্যকর সংসদ, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভূমিকা পালন করে, তাই জনগণের স্বার্থ রক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। মজার ব্যাপার, ইউক্রেন সংকটের পেছনে গণতন্ত্রের এই দিকটার একটা প্রভাব আছে।

সত্যিকার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় থেকে চেষ্টা করে, জনগণকে যতটা বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়। তার মাথায় থাকে পরবর্তী নির্বাচনেও জিতে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর ক্ষমতাসীনরা ভেবেছে, রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কিনে যদি সস্তায় মানুষের কাছে সেটা পৌঁছে দেওয়া যায়, মানুষ তাতেই খুশি থাকবে। আর কোনো সরকার যদি রাশিয়ার ওপর জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি কিনতে যেত, সেটার বাড়তি ব্যয় মানুষকে অসন্তুষ্ট করত এবং সেই অসন্তুষ্টি বিরোধী দলগুলোর অস্ত্রে পরিণত হতো।

এমনকি উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগ মানুষই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে জানে না। তাই আজ ইউরোপে যখন একটা যুদ্ধ লেগে গেছে, তখন পশ্চিম ইউরোপের সব দেশের বেশিরভাগ মানুষের মতামত রাশিয়ার জ্বালানি বন্ধ করার পক্ষে হলেও এমন যুদ্ধ না লেগে গেলে তারা সেটা চাইত না। সে রকম কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ক্ষমতাসীন সরকারকে চরম বিপদে ফেলে দিত। প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হওয়া মানে প্রতিটা জিনিসের মূল্য বেড়ে যাওয়া। এমন পদক্ষেপ নিয়ে সেই সরকার পুনর্নির্বাচিত হতে পারার কথা নয়। তাই জ্বালানিনির্ভরতা কমানো দূরে থাক, ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি নিয়ে রাশিয়ার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে শুরু করেছিল।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপ এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞায় অংশ তো নিচ্ছেই; ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা পর্যন্ত দিচ্ছে। অথচ অবিশ্বাস্যভাবে এখনও ইউরোপ রাশিয়ার লাইফলাইন জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। এই যুদ্ধের অকল্পনীয় খরচ উঠিয়ে আনার টাকার একটা বড় অংশ জোগান দেবে ইউরোপের এই জ্বালানি কেনা।

মূলত ইউরোপে জ্বালানি বিক্রির টাকাতেই ফুলে-ফেঁপে উঠছিল রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সেই টাকাতেই পুতিন আর তার অলিগার্করা অকল্পনীয় পরিমাণ ব্যক্তিগত সম্পদ বানিয়েছেন। সে টাকাতেই রাশিয়ার সামরিক শক্তি বেড়েছে এবং আধুনিক হয়ে উঠেছে। সেই টাকাই পুতিনকে সাহস দিয়েছে- যুদ্ধ বাধিয়ে দিলেও তিনি টিকে থাকতে পারবেন।

ভ্লাদিমির পুতিন এটাও জানতেন- ইউরোপ যতটা জ্বালানিনির্ভর হয়ে আছে তার ওপর, তাতে পশ্চিম ইউরোপের পক্ষে রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া অন্তত সম্ভব হবে না।

আজকের 'আধুনিক জার' ভদ্মাদিমির পুতিন তৈরি হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার। কীভাবে সেটাকে নিয়ে কাজ করে, এ ধরনের ঝুঁকি ভবিষ্যতে কমানো যায় সেই চিন্তা শুরু করাই হোক রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের অন্যতম শিক্ষা।

ডা. জাহেদ উর রহমান: শিক্ষক ও নাগরিক অধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×