ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

পেশাগত ঝুঁকিবিষয়ক শিক্ষা

পেশাগত ঝুঁকিবিষয়ক শিক্ষা
×

গোলাম শওকত হোসেন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২২ | ১৪:৪৪

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক উন্নয়ন আর জনগণের জীবনকে সহজতর করার প্রয়োজনে অবশ্যই দেশে শিল্পায়ন ও মেগা প্রজেক্টের প্রয়োজন আছে। তাই বলে যখন-তখন সাধারণ মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিনিময়ে নয়। শিল্পায়ন ও মেগা প্রজেক্টের জন্য বর্তমান আধুনিক বিশ্বে অকুপেশনাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেলথ-হ্যাজার্ডস ও সেফটি নামে একটি সাবজেক্ট আছে, যা পাবলিক হেলথ সায়েন্সের একটি অংশ। এই সাবজেক্টের মূল লক্ষ্য দুটি। যথা- শিল্পায়ন ও প্রজেক্টের কর্মীদের যাতে পেশাগত কোনো প্রকার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি না থাকে তা নিশ্চিত করা; শিল্পায়ন ও প্রজেক্টের কর্মস্থলের আশপাশের আবাসন, পরিবেশ বা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে কোনো প্রকার ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করা। বর্তমান বিশ্বের নিয়মানুযায়ী এই নীতিমালা মানা অবশ্যই সরকার, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা জনগণের জন্য বাধ্যতামূলক।

শিল্পায়ন ও প্রজেক্টের ক্ষেত্রে নূ্যনতম ১২টি স্টেকহোল্ডারের সমন্বয়ে কমপ্লায়েন্স বা নীতি-অনুবর্তিতা তৈরি হয়এ যথা- ১. জনগণ, ২. অর্থ লগ্নিকারী, ৩. আইন প্রণয়নকারী, ৪. কাস্টমার, ৫. প্রেশার গ্রুপ, ৬. ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ৭. মিডিয়া, ৮. পরিচালক, ৯. কর্মী, ১০. মালপত্র সরবরাহকারী, ১১. ম্যানেজার এবং ১২. অংশীদার। এই কমপ্লায়েন্সের মধ্য দিয়েই সুনিশ্চিত করতে হয় সবার ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও জামানত। সভ্য দেশ বা আইনসংগতভাবে চুলচেরা বিচার করলে গার্ডারে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে হয়তো ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। চকবাজারে আগুন লাগায় যে ক্ষতি হয়েছে তাতে চরম শাস্তি হওয়া উচিত শিল্প মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্র শিল্প বিষয়ে নিযুক্ত পরিদর্শক ও মালিকদের। গুলিস্তানের ঘটনার জন্য দায়ী মালপত্র সরবরাহকারী ও ম্যানেজারের চরম শাস্তি হওয়া উচিত এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মাধ্যমে আহত পথচারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। কিন্তু আমজনতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত।

হ্যাজার্ডস সেফটি নীতিমালা সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ১০টি দিকনির্দেশনা আছে। যথা- ১. হ্যাজার্ডস বা ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো নিয়ন্ত্রণ করা (পরিবেশ, বায়ু বা শব্দদূষণ, আশপাশের জনগণের নূ্যনতম স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিপত্তি ঘটানো), ২. নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ৩. চৌকস ও অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগ এবং কর্মপরিবেশকে উন্নত রাখা, ৪. সরকারি সংস্থাগুলোর উচিত এ ধরনের কাজকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা, ৫. ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রচুর সংখ্যক ব্যানার-ফেস্টুন ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে চারদিকের পরিবেশকে সর্বদা সতর্ক রাখা, ৬. ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ব্যাপারে কাজের ফ্লো-চার্ট দিয়ে সবাইকে সময় ও কাজের ধরন সম্বন্ধে অবহিত করা, ৭. মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন কোনো কাজ তাড়াহুড়া বা গোঁজামিল দিয়ে সম্পন্ন না করা, ৮. প্রতিটি যন্ত্রপাতি রেগুলার চেকিংয়ে আলাদা টিম রাখা, ৯. দীর্ঘমেয়াদি কাজে যন্ত্রপাতি চৌকস, মেধাবী ও অভিজ্ঞ থার্ড পার্টির লোক দিয়ে চেক করিয়ে সার্টিফাই করিয়ে নেওয়া নতুবা ওই কোম্পানির কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং ১০. সব কাজের রিপোর্ট প্রতি মাসে সরকারপক্ষের মনিটরিং সেলের কাছে জমা দেওয়া।

সুতরাং অকুপেশনাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেলথ-হ্যাজার্ডস ও সেফটি নামক সাবজেক্টকে সমাজের সর্বস্তরে প্রচারের মাধ্যমে পরিচিত ও সমাদৃত করতে হবে দেশ-জাতি ও উন্নয়নের স্বার্থে। দেশের প্রচলিত ঔপনিবেশিক আইনকে আইন কমিশন করে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে আবারও একই অন্যায় বারবার করতে না পারে। দুর্ঘটনা জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু তার কারণ যাচাই-বাছাই করে জবাবদিহি ও সমাধানের পথ বের করতে হবে এবং গাফিলতিকারী বা অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যত বেশি উপযুক্ত চেয়ারে উপযুক্ত লোককে বসাব, ততই দেশ থেকে অনাচার, অবিচার, আহাজারি দূর হয়ে দেশ উন্নততর হবে।

ডা. গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক, গবেষক ও শিক্ষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×