ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মৎস্য বনাম মৎস্যজীবী

মৎস্য বনাম মৎস্যজীবী
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২২ | ২১:১৫

ইলিশের প্রজননকাল নির্বিঘ্ন রাখিতে একদিকে সরকার বৃহস্পতিবার মধ্যরাত্রি হইতে নির্দিষ্ট নদী-অঞ্চল ও সমুদ্রের মোহনায় সকল প্রকারের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ করিয়াছে; অন্যদিকে প্রভাবশালীরা এই নির্দেশনা লঙ্ঘনের জন্য প্রস্তুত হইতেছেন বলিয়া খবর দিয়াছে বৃহস্পতিবারের সমকাল। বস্তুত প্রতি বৎসরই তাঁহারা এইরূপ নিয়মভঙ্গ করিয়া থাকেন। ইহাতে ইলিশ উৎপাদনে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হইয়া থাকে। আমরা জানি, এপ্রিল-মে মাসে জাটকা এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে মা ইলিশ রক্ষায় প্রতি বৎসর সরকার দুই-তিন সপ্তাহ নদনদী ও সাগরে সকল প্রকারের মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করিয়া থাকে। এই সময়ে আশ্বিনের অমাবস্যা ও ভরা পূর্ণিমায় মা ইলিশ ডিম পাড়িতে সমুদ্র ছাড়িয়া নদীতে আসিয়া থাকে এবং ৮০ শতাংশ ডিমই এই সময় ছাড়িয়া থাকে। একটি মা ইলিশের উদরে ২৫ লক্ষ ডিম থাকে বলিয়া তাহার উল্লেখযোগ্য অংশ রক্ষা করিতে পারিলেও ইলিশের উৎপাদন যেন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইতে পারে, তাহা সহজেই বোধগম্য।
গৌরবের বিষয় হইল, ইলিশ আমাদের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য এবং বিশ্বে উৎপাদিত বিপুল অধিকাংশ ইলিশ বাংলাদেশেই উৎপাদন হইয়া থাকে। আমরা মনে করি, নিষেধাজ্ঞার দুই মৌসুমে ইলিশ আহরণ স্থগিত রাখিতে পারিলে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। প্রাপ্ত হিসাবও বলিতেছে, প্রতি বৎসর বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ক্রমবর্ধমান। এক যুগ পূর্বেও ইলিশ আহরণ ছিল প্রায় তিন লক্ষ টন। বর্তমানে তাহা পাঁচ লক্ষ টন অতিক্রম করিয়াছে। ইহাও অনস্বীকার্য, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং গবেষণা এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করিয়াছে।
আমরা দেখিয়া আসিয়াছি, ইতোপূর্বে প্রজনন মৌসুমে মৎস্য আহরণ বন্ধের সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয় নাই। গত বৎসরও নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে পরিচালিত কয়েক সহস্র অভিযানে প্রায় অর্ধশত টন মা ইলিশ জব্দ করা হইয়াছে এবং আটক করা হইয়াছে দেড় সহস্রাধিক জেলেকে। ইহাতেই নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরিবার প্রবণতা স্পষ্ট হইয়া যায়। যদিও সংশ্নিষ্টরা বলিতেছেন, এই পরিসংখ্যান প্রকৃতপক্ষে মৎস্য আহরণের ১০-১২ শতাংশ মাত্র। বিশেষ করিয়া সমকালের বৃহস্পতিবারের প্রতিবেদনটি তাহাই নির্দেশ করিতেছে- স্থানীয় প্রভাবশালীরা মৎস্য অধিদপ্তরের কিছু মাঠ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরোক্ষ সহযোগিতায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ ধরিয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে কড়া নির্দেশনা থাকা আবশ্যক, যাহাতে সংশ্নিষ্ট মাঠ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে।
তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য সরকার যে রূপ সহায়তা প্রদান করিয়া থাকে, তাহা যথাযথভাবে বিতরণ করা হয় না বলিয়াও অভিযোগ বিস্তর। এই সময়ে সারাদেশের জেলে পরিবারকে ২০ কেজি করিয়া খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ দিয়া থাকে। এই সহায়তা যদি মাঠ পর্যায়ে জেলেদের হস্তগত না হইয়া থাকে তাহা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। কারণ জেলে পরিবারগুলি শুধু মৎস্য আহরণ করিয়াই জীবিকা নির্বাহ করিয়া থাকে। ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞাকালে সকল ধরনের মৎস্য শিকারে বাধা থাকায় তাঁহারা নিরুপায় হইয়া পড়েন। সেই জন্য জেলেদের তালিকা করিয়া খাদ্য সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করিতে হইবে সর্বাগ্রে। তবে ইহাও সত্য, অনেক সময় আমরা দেখিয়াছি, ইলিশ সুরক্ষা অভিযানের নামে জেলেদের উপর নিপীড়নের ঘটনা ঘটিয়াছে। একান্তই জীবিকার তাগিদে যে সকল জেলে এই সময় মৎস্য শিকার করিয়া থাকেন, তাঁহাদের বিষয়ে কঠোরতর মনোভাব প্রত্যাশিত নহে। তাঁহাদের কারাগারে না পুরিয়া কিংবা জাল-নৌকা ধ্বংস না করিয়া লঘুদণ্ডের বিষয়টি সংবেদনশীলতার সহিত বিবেচনা করা আবশ্যক।
ইলিশের উৎপাদন বাড়াইতে একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা চাই; তৎসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ইলিশের জীবনচক্রে যে পরিবর্তন আসিয়াছে, সেইদিকেও দৃষ্টিপাত প্রয়োজন। নদীর নাব্য সংকট, দূষণ, প্রবেশপথে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি দূর করিবার পাশাপাশি ইলিশের চলাচল পথ নির্বিঘ্ন রাখিতে হইবে। ইলিশের অভয়াশ্রমগুলিতে নজরদারি বৃদ্ধি; ইহার প্রজননকালে নদীতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালি উত্তোলনের কারণেও ইলিশের ডিম ও রেণু পোনার যে ক্ষতি হইতেছে সেইদিকেও দৃষ্টি দেওয়া চাই। সর্বোপরি প্রশাসন, জেলে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা আমাদের সামষ্টিক দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে ইলিশ সুরক্ষা এবং ইহার উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত হইতে পারে।

আরও পড়ুন

×