ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি

জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া 'রাষ্ট্র মেরামত' অসম্ভব

জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া 'রাষ্ট্র মেরামত' অসম্ভব
×

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৪:১০

রাজধানী ঢাকায় ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলনের সময় একটি স্লোগান বেশ সাড়া জাগিয়েছিল- 'রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।' শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিকেই রাষ্ট্র মেরামতের কাজ বলে অভিহিত করেছিল। সম্ভবত তাদের কচি মনে এ ধারণা জন্মেছিল- আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রটি ঠিকমতো কাজ করছে না। তাই এর মেরামত দরকার। শিক্ষার্থীদের মনে উদিত হওয়া ভাবনা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার ত্রুটিগুলো হরহামেশা চোখে পড়ে। তা নিয়ে এদিক-সেদিক আলোচনাও হয়। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। এর প্রধান কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার যারা নিয়ামক, সেই রাজনৈতিক শক্তি এর প্রয়োজন বোধ করে না।

গত ১৯ ডিসেম্বর হঠাৎ বিএনপি ২৭ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি উপস্থাপন করেছে, যেটাকে তারা অভিহিত করছে 'রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা' নামে। বিএনপির এই রাষ্ট্র মেরামত-ফর্মুলা রাজনীতি বেশ আলোচিত হচ্ছে। কারণ, এত দিন তারা সরকার পতন এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের এক দফার আন্দোলনে ছিল। এর পর গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশে তারা ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই ঘোষণার ৯ দিনের মাথায় তারা ঘোষণা করল তাদের ভাষায় 'রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা'। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- বিএনপির আসল কর্মসূচি কোনটি? এক দফা, ১০ দফা, নাকি ২৭ দফা? তা ছাড়া এই রূপরেখা নিয়ে আরও একটি ধন্দ তৈরি হয়েছে- এটি কি তাদের কর্মসূচি, নাকি দাবিনামা? দাবিনামা হয়ে থাকলে কাদের কাছে তারা দাবি জানাচ্ছে? যে সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন দেখছে, তাদের কাছে দাবি জানাচ্ছে কোন যুক্তিতে? আর যদি কর্মসূচি হয়ে থাকে তাহলে এটি বাস্তবায়নে তাদের পাড়ি দিতে হবে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ এক সমুদ্র। প্রথমে জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকারে যেতে হবে। তারপর সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটুকু সম্ভব, ভেবে দেখার বিষয়।

কী আছে বিএনপির দেওয়া রূপরেখায়? সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন বাতিল, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে একই ব্যক্তির দুইবারের বেশি নির্বাচিত না হওয়া, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ইত্যাদি। নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখলে এ রূপরেখা ইতিবাচকই বলতে হবে।

দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না- একে অনেকেই বলছেন, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সংস্কার প্রস্তাবেরই নবতর সংস্করণ। এ ছাড়া বিএনপির নেতাকর্মী এখনও বিশ্বাস করেন, দল ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়াই হবেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকি সম্প্রতি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই কথা বলেছেন। তাহলে রূপরেখা প্রণেতারা কেন এমন একটি দফা সংযুক্ত করলেন? বিএনপির চাবিকাঠি কি এখন সংস্কারপন্থিদের হাতে?

এদিকে এই রূপরেখা বাস্তবায়ন নিয়ে কথা উঠেছে। বিএনপি অবশ্য বলেছে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশীদারদের সঙ্গে নিয়েই জাতীয় সরকার গঠন করবে এবং রাষ্ট্র মেরামতের কাজে হাত দেবে। কিন্তু সেই নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার আদৌ প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা, অনিশ্চিত। সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, সংবিধান নির্দেশিত বিধান মোতাবেক আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই সঙ্গে এটাও পরিস্কার হয়ে গেছে- বিএনপির নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি সরকার মেনে নেবে না। সরকারের এ অনমনীয়তাকে পরাস্ত করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ের সক্ষমতা দলটির আছে কিনা- সেটাও এক প্রশ্ন। সে জন্যই ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশ নেওয়া এখনও অনিশ্চিত। চলমান আন্দোলনে সফলতা না পেয়ে তারা যদি ভোটে যায়, তাহলে যে ফলাফল হবে, তাতে রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দেওয়ার সক্ষমতা তারা অর্জন করতে পারবে বলে মনে হয় না।

বিএনপি ঘোষিত 'রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখা' নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা নানা মন্তব্য করছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপির রূপরেখাকে 'স্টান্টবাজি' আখ্যায়িত করে বলেছেন, 'যারা ধ্বংস করে, যাদের হাতে রক্তের দাগ, তারা কীভাবে মেরামত করবে? এটা অত্যন্ত হাস্যকর। এতে আন্দোলন জমবে না, মানুষ বিভ্রান্ত হবে না।' (সমকাল, ২১ ডিসেম্বর, ২০২২)।

বিএনপির রূপরেখার বিপরীতে এমন প্রতিক্রিয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, আমাদের দেশে এমন নজির নেই যে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের কোনো প্রস্তাবনা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছে কিংবা বিরোধী দল সরকারের ভালো কোনো পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। সুতরাং আমরা এটা ধরে নিতে পারি, সরকার বা বিরোধী দল যে যে কথাই বলুক, অপর পক্ষ তা বাঁকা দৃষ্টিতেই দেখবে; স্বাগত জানানো দূরের কথা। বিএনপির ২৭ দফাকে আওয়ামী লীগ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেও নাগরিক সমাজ এর প্রয়োজনীয়তা একেবারে ঝেড়ে ফেলে দেয়নি। অেেনকে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব কথা তুলে ধরেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তার সবটা না হলেও বেশ কিছু বিষয়ে সংস্কার আবশ্যক এবং সে জন্য জাতীয় ঐকমত্যের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, এককভাবে কারও পক্ষে এ সংস্কার করা অসম্ভব।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×