অধিকার
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গণ্ডদেশে চপেটাঘাত
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৩ | ২১:১৭
ঘটনাটি এতটাই ন্যক্কারজনক যে তা নিয়ে কথা বলতেও লজ্জা করে। প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে এক উদ্ধত যুবক একজন বয়স্ক বিশিষ্ট নাগরিকের গালে চড় মেরে দিলেন! ভদ্রলোকের অপরাধ, তিনি দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে লিফলেট বিলি করছিলেন। ঘটনাটি সদ্যবিদায়ী বছরের ২৪ ডিসেম্বরের। ওই দিন রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে সুষ্ঠু ভোটের দাবিতে লিফলেট বিতরণ করছিলেন বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক। তিনি যখন কোনো একটি মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, সে সময় এক ব্যক্তি এসে তাঁর গালে চপেটাঘাত করেন।
এ ঘটনা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়; নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে দেশজুড়ে।
ঘটনার পর ম. ইনামুল হক আক্ষেপ করে বলেছেন, জনগণের দাবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হলাম! যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তিনি আক্রমণকারীকে চিহ্নিত করতে পারেননি। তবে পরে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা গেছে। তাঁর নাম বানি আমিন, বাড়ি মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলায়। তিনি সেখানকার কাজীপুর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি। ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, সেদিন তিনি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। পথে এক প্রবীণ ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে দেখে তিনি তাঁকে লাঞ্ছিত করেছেন (সমকাল, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২২)।
কী চমৎকার সরল স্বীকারোক্তি! এ যুগে এমন সত্যবাদী পাওয়া আসলেই কঠিন। বানি আমিনকে ধন্যবাদ যে তিনি অপরাধ অস্বীকার করেননি। কিন্তু হতাশ হতে হয়েছে তাদের অভিভাবক সংগঠনের আচরণে। একটি সহযোগী সংগঠনের ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন কর্মী দেশের একজন বয়স্ক, বিশিষ্ট নাগরিককে লাঞ্ছিত করলেন অথচ এ সম্পর্কে তারা টুঁ শব্দটিও করলেন না!
সেদিন ঢাকায় ছিল আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। সে অনুষ্ঠানে সহযোগী সংগঠনের ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন কর্মী ডেলিগেট হন কীভাবে? তাহলে কি এটি ধরে নিতে হবে- আওয়ামী লীগের ডেলিগেট সংকটের কারণে সহযোগী সংগঠনের ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন কর্মীকেও ডেলিগেট কার্ড দিতে হয়েছে?
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিষয়, তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে দেশবাসীর প্রশ্ন- একজন প্রবীণ ও বিশিষ্ট নাগরিকের বিনা অপরাধে লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগের কাছে কতটা গুরুত্ব পেল? বোঝাই যাচ্ছে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। যদি হতো, তাহলে খবরটি অন্তত পাওয়া যেত- ওই বেয়াদব কর্মীর বিরুদ্ধে তারা কী অ্যাকশন নিয়েছে।
ঘটনাটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। কেননা এই ধরনের উদ্ধত কর্মীরাই আশকারা পেতে পেতে ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। প্রবাদ আছে- 'কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হয়'। এও তেমনি। এসব 'ছোটখাটো' অপরাধের যদি সঠিক বিচার ও অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা না হয়, তাহলে অন্যরাও একই অপকর্মে জড়িত হতে সাহস পাবে। এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের জাতীয় সংবিধান নাগরিকদের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে মতপ্রকাশের, কথা বলার। রাষ্ট্রীয় যে কোনো ব্যাপারে একজন নাগরিক অধিকার রাখেন তাঁর নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করার। তাঁর কথার সঙ্গে সবাই একমত হবেন এমন নয়। দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে সেই দ্বিমত প্রকাশ বা বিরোধিতারও প্রথাসিদ্ধ নিয়ম আছে। পাল্টা সভা ডেকে বা সংবাদমাধ্যমের কাছে যে কেউ তাঁর ভিন্নমত ব্যক্ত করতে পারেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কেউ কারও গায়ে হাত তুলতে পারেন না। এটি প্রচলিত আইনে ফৌজদারি অপরাধ।
দুর্ভাগ্যবশত, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। সৌহার্দ্য, সহিষুষ্ণতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সেখান থেকে উধাও হয়ে গেছে। পরিবর্তে ঠাঁই করে নিয়েছে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহনশীলতা এবং পেশি শক্তি দিয়ে একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক অসুস্থ মানসিকতা।
ফলে নানা স্তরে তৈরি হচ্ছে বানি আমিনদের মতো কর্মী; যারা বিরুদ্ধবাদীদের ওপর চড়াও হতে দ্বিধা করেন না।
গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর মধ্যে এক ধরনের 'ড্যাম কেয়ার' মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করেন, তাদের জন্য কোনো আইনকানুন নেই। তারা যত অপরাধই করুন, আইন তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না। ব্যতিক্রম কয়েকটি ঘটনা ছাড়া গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক নজির স্থাপিত হয়েছে। অপরাধ করেও তারা থেকে গেছেন আইনের আওতার বাইরে। যেন রাষ্ট্রক্ষমতা তাদের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত'। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিষয় নয়, পরিবর্তনশীল- এটি তারা যত দ্রুত বুঝবেন, ততই মঙ্গল।
মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক
