রাজনীতি
আজ বহিস্কার, কাল আবিস্কার
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৯:০৭
সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ডা. মুরাদ হাসানের ক্ষমা পাওয়ার খবরটি অনেককে বিস্মিত করেছে। ২৭ জানুয়ারির পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে যাঁদেরকে ইতোপূর্বে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে যাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন তাঁদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। সে তালিকায় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত এবং দল থেকে বহিস্কার হওয়া সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের নামও রয়েছে।
এই ক্ষমা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর দলের জাতীয় কমিটির সভায়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই ২২ ডিসেম্বর দলের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে ডা. মুরাদ হাসান দলীয় ক্ষমা পেয়ে গেছেন।
২০২১ সালে কতিপয় অশালীন বক্তব্য-মন্তব্যের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এ আওয়ামী লীগ নেতা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমাকে নিয়ে একটি ফেসবুক পেজে তাঁর কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর মন্তব্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর রেশ না কাটতেই দেশের এক চিত্রনায়িকার সঙ্গে তাঁর অশ্নীল কথোপকথনের অডিও ভাইরাল হয়। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে মুরাদ হাসান ওই নায়িকাকে ধর্ষণের হুমকি দেন; তাঁকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তুলে আনারও হুমকি দিয়েছিলেন। এতে সমাজের সর্বস্তর থেকে মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং সরকারের ভাব-মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মাধ্যমে মুরাদকে পদত্যাগের নির্দেশ দিলে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তাঁকে দলের সর্বস্তর থেকে বহিস্কার করা হয়। সেই থেকে প্রায় এক বছর তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিলেন। তবে তাঁর সংসদ সদস্যপদ বহাল আছে।
রাজনৈতিক দলে বহিস্কার কোনো অভিনব ঘটনা নয়। নানা কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে। সেসব কারণের মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ কিংবা দলের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা অন্যতম। প্রতিটি দলের গঠনতন্ত্রে পরিস্কার লেখা থাকে- দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দলের স্বার্থ হানিকর কর্মকাণ্ড কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা অথবা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিস্কারের ক্ষমতা দল সংরক্ষণ করে। তবে এ বহিস্কারের রীতি-পদ্ধতি একেক দলে একেক রকম। নেতাকর্মীকে গঠনতন্ত্রের সেসব ধারা মেনে চলতে হয়। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরেই গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত নীতিমালা কঠোরভাবে প্রতিপালনের একটি বিধান সব দলেই মোটামুটি অনুসরণ করা হয়।
আবার নানা কারণে দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া বা বহিস্কার হওয়া ব্যক্তিদের পুনরায় দলে প্রত্যাবর্তনও নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর অনেক নজির রয়েছে আমাদের দেশে। লক্ষ্য করার বিষয়, যখন ওইসব ব্যক্তিকে দল বা সরকার থেকে বহিস্কার করা হয়, তখন সরকার বা দলীয় ভাষ্যে মনে হয়, এ ব্যক্তি জীবনে আর কোনো দিন দলে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক সময় ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরে আসেন।
১৭ ডিসেম্বরের সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ও বিভিন্ন সময়ে দলীয় শৃঙ্খলা ও স্বার্থ হানিকর কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ইতোপূর্বে বহিস্কৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। বলা হয়েছে, যাঁরা অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়ে দোষ স্বীকার করে আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তাঁদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন এ ক্ষমা পেয়েও গেছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, দল যদি মনে করে- কর্মীদের দলে ফিরিয়ে নেওয়া দরকার, তাহলে তারা সে সিদ্ধান্ত নিতেই পারে।
বিএনপির কথাই ধরা যাক। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যাঁরা দল ও চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মালকোঁচা মেরে নেমেছিলেন, তাঁরা কিন্তু সহজেই ক্ষমা পেয়ে গেছেন। ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর রাতে সাইফুর রহমানের বাসায় বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একটি অবৈধ সভায় খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে সাইফুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অস্থায়ী মহাসচিব করা হলো। দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে এমন 'সাংগঠনিক মিউটিনি' অর্থাৎ ব্যর্থ অভ্যুত্থানকারী সেই নেতারা সহজেই ক্ষমা পেয়ে গেছেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ জন্য তাঁদের আনুষ্ঠানিক ক্ষমাও চাইতে হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোতে এমন হয়। আর এসব কাজ জায়েজ করার জন্য ফতোয়া হিসেবে রয়েছে সেই অতি প্রাচীন আপ্তবাক্য- 'রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।' যেহেতু রাজনীতিতে শেষ কথা নেই, তাই আজকের বহিস্কৃত ব্যক্তি আগামীকাল নতুনভাবে আবিস্কৃত হবেন। তাতে আর বিচিত্র কী!
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা দলের স্বার্থবিরোধী কাজ করা আর নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ কিন্তু এক নয়। ডা. মুরাদ হাসানকে যে কারণে বহিস্কার করা হয়েছিল, তাতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের চেয়ে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধই ছিল মুখ্য। খালেদা জিয়ার নাতনিকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জন্য না হলেও চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকে টেলিফোনে নানা অশ্নীল কথাবার্তা বলে যেভাবে তিনি খোলাখুলি কুপ্রস্তাব দিয়েছিলেন; তাকে যৌন হয়রানি বলা অসংগত হবে না। এ অপরাধ অন্য একজন সাধারণ মানুষ কিংবা আওয়ামী লীগের বাইরের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি করলে তাঁর বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা হতো, বলা মুশকিল। কিন্তু মুরাদ হাসান ভাগ্যবান। দলের সদস্যপদ হারিয়েছিলেন, আবার ফিরেও পেয়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নও হয়তো পেয়ে যাবেন। তবে পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ থেকে ইতোপূর্বে বহিস্কৃত নেতারা ক্ষমা পেলেও পদ-পদবি ফিরে পাবেন না। দলের সাধারণ সদস্য হিসেবেই তাঁদের থাকতে হবে। সেটাই বা মন্দ কী! সময়মতো এই সাধারণরাই হয়ে উঠবেন অসাধারণ। কথায় আছে- একবার দাঁড়ানোর জায়গা পেলে পরে বসা এমনকি শোয়ার ব্যবস্থাও হয়ে যায়।
আমরা জানি, ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ, তবে সব অপরাধের জন্য নয়। কিছু গর্হিত অপরাধের শাস্তি তো ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও রাখা দরকার। অন্যথায় অপরাধপ্রবণতা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।
মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক
- বিষয় :
- রাজনীতি
- মহিউদ্দিন খান মোহন
