অন্যদৃষ্টি
উৎসবের অর্থনীতি
কাজী সুফিয়া আখ্তার
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৩ | ২৩:০৩
প্রাচীনকাল থেকে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশে এটি সর্বজনীন উৎসবও বটে। গ্রামবাংলার কৃষিজীবী মানুষ চৈত্র মাসের শেষ দিন, বাংলা বছরের শেষ দিনে চৈত্রসংক্রান্তির পূজা, শিবপূজা, গাজন গান ও চড়ক মেলা দিয়ে বর্ষবিদায় করে নতুন বছর বরণের প্রস্তুতি নেয়। পণ্যবিনিময় প্রথাকালীন এ সময়ে গ্রামে গ্রামে মেলা বসত কিনা, সে বিষয়ে খুব তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মুদ্রা আবিষ্কারের পরে এ উপলক্ষে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ওই সময়ে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত। এ মেলার গুরুত্ব যত উপলব্ধি হতে থাকল, জনজীবনে তার প্রতিফলনও দেখা গেল। বিভিন্ন স্থানে মেলার সংখ্যা এবং দিন বাড়তে থাকল। কারণ মেলা থেকে স্থানীয় লোকজন তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সারা বছরের জিনিসপত্র কিনে নিতেন। তখন হাটে-মাঠে-ঘাটে সবসময়ের বাজার ছিল না। অনেক দূরে দূরে ছিল হাট। যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো ছিল না।
স্বভাবতই গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎসবকেন্দ্রিক স্থানীয়ভাবে আয়োজিত এসব চৈতি মেলা, গঙ্গাঘাটের মেলার গুরুত্ব ছিল অপরিমেয়। মেলায় পাওয়া যেত না, এমন কিছু ছিল না। কাঠের পালঙ্ক থেকে হাতা, বড় থালা, রুটি বেলার বেলুন-পিঁড়ি, জলচৌকি, মাকু-সিন্দুক-চরকা; বাঁশ-বেতের ঝুড়ি, চাল মাপার বিভিন্ন সাইজের সের, ধানের ডোলা, শীতলপাটি, হোগলা, আসন; কুমারের বানানো মাটির থালা, হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই, তাগাড়ি, কলস, পিলসুজ, ঢাকনি; কয়েক প্রকার হাঁড়ি– ভাতের হাঁড়ি, রসের হাঁড়ি, পিঠা রাখার নকশি হাঁড়ি; মাটির পুতুল, হাতি-ঘোড়া-ঘট; কামারের বানানো কোদাল, লাঙলের ফলা, কাঁচি, শাবল, নিড়ানিসহ আরও কত কী! তিলের নাড়ু, গজা, মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া, নারকেলের নাড়ু, গুড়ের বাতাসা, চিনির বাতাসা, হাতি-ঘোড়া-বাঘ-ভালুক-হরিণের পাশাপাশি ঘোষদের তৈরি মণ্ডা-মিঠাই-রসগোল্লা তো ছিলই। কৃষকের ধান-চাল-পাট-সরিষা-তিল-তিসি-মসুর-মুগ ডাল বেচাকেনার বাজার। তাঁতিদের তৈরি লুঙ্গি-গামছা-তাঁতের শাড়ি– এসবই বিভিন্ন পেশাজীবীর তৈরি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। মেলা ছিল উৎপাদিত পণ্যের বাজার। গ্রামের সাধারণ মানুষের সচল জীবনের প্রতিচ্ছবি।
সময় বদলেছে। যুগের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। পারিবারিক পেশা ছেড়ে অনেকে চাকরি ও ব্যবসার বদৌলতে অন্যত্র বসবাস করছেন। আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে মানুষের ভোগ বেড়েছে। ভোগ্যপণ্যের বাজার বেড়েছে। বাজার অর্থনীতিও আজ বহুমুখী। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তিনটি খাতের ওপর সচল রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত। আমাদের গার্মেন্ট শ্রমিকরা বৈদেশিক আয়ের গর্বিত অংশীদার। দ্বিতীয়টি হলো, প্রবাসী বাঙালিদের আয়। তৃতীয়টি হলো, কৃষি। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশ আজ চালে উদ্বৃত্ত, ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম। মৎস্য উৎপাদনে পঞ্চম। ইলিশ ও পাট রপ্তানিতে প্রথম। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৪১ শতাংশ কৃষিতে জড়িত। এ ছাড়া বর্তমান বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তা বৈশ্বিক বিরূপ পরিস্থিতি ও দেশীয় প্রতিকূলতা পেরিয়ে গড়ে তুলেছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অনেক নারী উদ্যোক্তাও আছেন। স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে তাঁরা বেশ ভালো করছেন। তাঁরা বিভিন্ন দিন বা উৎসব সামনে রেখে মেলার আয়োজন করে থাকেন। এগুলো মাঠে হয় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হলরুমে হয়। এতে তাঁরা শুধু নিজেরা লাভবান হচ্ছেন না, স্বদেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা ও অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। এতে স্বকর্মসংস্থনের পথ সৃষ্টি হচ্ছে।
খরতাপদাহে শরীর যত ঘর্মাক্ত হোক, মাথা রৌদ্রের উত্তাপে ব্যথা করুক, বাংলার শ্রমজীবী মানুষ কিন্তু বসে নেই। উৎসব উপলক্ষে পণ্য উৎপাদনের কাজ করে চলেছেন। এ উৎসব মাটিঘেঁষা শ্রমজীবী মানুষের উৎসব। যদিও এখন ঢাকা এবং অন্যান্য জেলা শহরে ফ্যাশন ডিজাইনার, টেইলারদের ঘুম নেই। ঘুম নেই শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে টুপি তৈরি ও পাখা তৈরির কারিগরদের; বিভিন্ন গ্রামের নকশিকাঁথা তৈরির শিল্পীদের। কুমার-কামার-ভাইবোনদের। উৎসবের এই অর্থনীতির আনন্দ উৎস কোনোভাবেই যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।
কাজী সুফিয়া আখ্তার: নারী অধিকার কর্মী ও গবেষক
