ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিতর্ক

আওয়ামী লীগই বিদেশি প্রভাব ডেকে এনেছে

আওয়ামী লীগই বিদেশি প্রভাব ডেকে এনেছে
×

ড. মাহবুব উল্লাহ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৩ | ০৪:৫১

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বাগ্‌যুদ্ধের বর্তমান বিষয় বিএনপির আন্তর্জাতিক তৎপরতা এবং পুলিশের তালিকা প্রণয়ন। বিষয়টিকে দুই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন দু’জন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ এবং ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মান্নান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজুর রহমান মানিক ও মিজান শাজাহান

সমকাল: আওয়ামী লীগ অভিযোগ করছে, জনসমর্থন হারিয়ে বিএনপি বিদেশিদের সহায়তায় ক্ষমতায় আসতে চায়। আপনি কীভাবে মন্তব্যটি বিচার করেন?

মাহবুব উল্লাহ: আওয়ামী লীগ কি বিদেশি সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় টিকে আছে? কিছুদিন আগে আমরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনকে বলতে শুনেছি, তিনি ভারতে গিয়ে ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষমতায় কে থাকবে না-থাকবে, সেটি কিছুতেই কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের এখতিয়ারাধীন হওয়া উচিত নয় এবং কাম্যও নয়। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, সেখানে সবচেয়ে বড় বলি হয়েছে গণতন্ত্র। আমরা গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে দেখেছি। এ ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মামলা, গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। মানুষ খুবই ভয়-ভীতির মধ্যে দিন যাপন করছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। যখন দেখলাম যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য দেশগুলো সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে, তখন বিরোধী দলের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের ব্যাপারে যেভাবে তৎপর হতে বাধ্য হয়েছে, তার জন্য মূলত দায়ী বর্তমান সরকারের গণতন্ত্রহীন শাসন পদ্ধতি।

সমকাল: বিএনপি থেকে পুলিশের তালিকা করা হয়েছে। এটি বিদেশি দূতাবাস কিংবা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তুলে দেওয়াটা দেশের জন্য কতটুকু সম্মানজনক?

মাহবুব উল্লাহ: এর জবাব হচ্ছে, এ রকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য শাসক মহলই দায়ী। বিএনপির পিঠ যেভাবে দেয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ফলে বিএনপিকে টিকে থাকার জন্য কৌশলী অবস্থান বেছে নিতে হচ্ছে। আদর্শগতভাবে এ রকম অবস্থান অসংগত মনে হলেও যখন বিকল্প কিছু পাওয়া যায় না, দেশে যখন আইনের শাসন থাকে না, তখনই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আবারও বলি, আমাদের দেশটা সুন্দর হতো এবং নাগরিকদের জীবন স্বস্তিদায়ক হতো যদি গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত থাকত; মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত না হতো।

সমকাল: কোনো দল কি এ ধরনের তালিকা করতে পারে? এর জন্য একটি স্বাধীন কমিশন হতো পারত।

মাহবুব উল্লাহ: আমরা যে কোনো ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করি। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দলীয়করণ যে নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, কোনো তদন্ত কমিশন করে এ সমস্যার সুরাহা আশা করা যায় না। আবারও বলি, দেশে এমন একটি পরিবেশ ফিরে আসুক, যেখানে তদন্ত কমিশন সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন হয় এবং কোনো বিদেশি শক্তির কাছে ধরনা দিতে না হয়। বাংলাদেশে দুটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এতটাই অবনতি ঘটেছে যে বলতে হয়, এটি এখন পারস্পরিক নির্মূলকরণের রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রে এ অবস্থা কাম্য নয়। যতই দিন যাচ্ছে সাংঘর্ষিক রাজনীতি ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। এ সংঘর্ষ হতে পারে দৈহিক,  হতে পারে বাকসংঘর্ষ। এখন দুই দলের সাধারণ সম্পাদক ও মহাসচিব পর্যায়ে যে বাক্যবিনিময় চলছে, তাতে মনে হয় না দেশে কোনো দিন সুষ্ঠু পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক সহনশীলতা ফিরে আসবে। যতদিন রাজনৈতিক সহনশীলতা ফিরে না আসবে ততদিন জনগণকে অগণতান্ত্রিক রাজনীতির কুফল বয়ে বেড়াতে হবে। তবে বাগ্‌যুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেব যেভাবে কথা বলেন, তাতে মনে হয় না, তিনি ৭০ দশকের রাজনীতির প্রডাক্ট। দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে না। ফলে দেশ শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হচ্ছে না।

সমকাল: আওয়ামী লীগ-বিএনপির এই রেষারেষির চূড়ান্ত পরিণাম কী হতে পারে?

মাহবুব উল্লাহ: সাংঘর্ষিক রাজনীতির জন্য দায়দায়িত্বের পরিমাণ রাজনৈতিক দলগুলোর কাঁধে যতটাই থাকুক না কেন, তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতির গৃহবিবাদে বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনীতি জড়িয়ে গেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। এ পরিস্থিতিতে বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে সংযমের চর্চা না করলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংঘর্ষের মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। একজন নাগরিক হিসেবে আমি চাই, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুবিবেচনা ও শুভবুদ্ধির উদয় হোক। তা না হলে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে পড়বে। আমি সে ধরনের কোনো দৃশ্য দেখতে চাই না। বিদেশি হস্তক্ষেপই বলি অথবা দেশের ভেতরে যে অস্থিরতা ভাব, তার অবসান সম্ভব একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে। এ জন্য প্রয়োজন একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার।

সমকাল: জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক তৎপরতা ও সরকারের অবস্থানকে কীভাবে দেখছেন?

মাহবুব উল্লাহ: জামায়াতকে বহু বছর পর প্রকাশ্যে চার দেয়ালের মধ্যে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া নিয়ে নানাজন নানা মত প্রকাশ করছেন। কেউ বলছেন, এটি জামায়াতকে বাগে আনার জন্য সরকারের একটি প্রয়াস। আমার কাছে সে রকম কিছু মনে হয় না। রাজনীতি এখানে এই মুহূর্তে যেভাবে বিকশিত হচ্ছে, তাতে মনে হয়, এটি বিকাশমান পরিস্থিতিরই একটি পরিণতি। মনে হচ্ছে ওয়ার অন টেররের নামে এতদিন যে বিশ্ব রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছিল, সেই যুগের অবসান হতে চলেছে। এখন মনে হয় মহাশক্তিগুলোর মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব ক্রমান্বয়ে তীব্র হয়ে উঠবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে মহাশক্তিগুলো তাদের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতাগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে তার ওপর। সব শেষে বলতে চাই– বাংলাদেশ হোক সুখী, স্বাধীন, সার্বভৌম গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধির অভিযাত্রী একটি দেশ। সব কোলাহল-কোন্দলের অবসান হোক।

আরও পড়ুন

×