বিজ্ঞান
ভারতের সফল চন্দ্রাভিযান ও আমাদের আক্ষেপ
মো. রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৩ | ০৬:৪৩
ভারতের চন্দ্রযান-৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণ করেছে– এ খবর যে পুরো বিশ্ববাসী খুব আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছে, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। আমাদের বাংলাদেশ সে আগ্রহের দৃষ্টিকোণ থেকে পিছিয়ে নেই মোটেও। অনেকের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে, স্বয়ং বাংলাদেশের চন্দ্রযান চাঁদে অবতরণ করেছে। এর বিপরীত ভাবনাটাই আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।
মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে অন্যের সফলতা দেখে আক্ষেপ করা– ইস্ ওরা পারল, আমরা কেন পারলাম না? এ ধরনের আক্ষেপের যৌক্তিকতা অবশ্য কম। কারণ আমরা নিজেদের খুব যোগ্য মনে করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম। ভারত তার নিজস্ব বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তির সহায়তায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণ করেছে, যা বিশ্বে প্রথম। আমরা ভাবছি, আমাদেরও তো স্পারসো নামে মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আছে বুয়েট, চুয়েট, রুয়েটের মতো ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়। তাহলে আমরা কেন পারছি না? এই আক্ষেপ আরও ঘনীভূত হয়েছে যখন স্পারসোতে কৃষিতে অনার্স ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে মাস্টার্স করা একজনকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে ট্রল করলেও একটা বিষয় কিন্তু খুব পরিষ্কার। তা হলো এ দেশে সব ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও মেধার মূল্যায়ন না হওয়া।
আমরা সবাই জানি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সবচেয়ে ভালো ফলধারীরাই পরে শিক্ষক হন (যদিও অন্য সব ক্ষেত্রের মতো এখানেও কিছু ব্যতিক্রম আছে); কিন্তু তাদের সুযোগ-সুবিধা বিসিএস ক্যাডারদের ধারেকাছেও নেই। আগে সচিব ও অধ্যাপক পদ এক থাকলেও ২০১৫-এর পে স্কেলে ১ থেকে ২০ গ্রেডের অতিরিক্ত দুটি সুপারগ্রেড ও পদ সৃষ্টি করে সিভিল সার্ভিসে চাকরির গুরুত্ব আরও বাড়ানো হয়েছে। গাড়ি, বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ– এমন কোনো সুবিধা নেই, যা এ চাকরিতে অনুপস্থিত। এমনকি বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন খুব বেশি না থাকলেও এ চাকিরতে এর সুযোগ রাখা হয়েছে ঢের বেশি। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক নম্বর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ কমানো হয়েছে।
যখন বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয় তখন অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন র্যাঙ্কিংয়ে জায়গা পায় না? আমরা শুধু অন্যের সফলতার সঙ্গে নিজেদের তুলনা করি কিন্তু কখনও পেছনের কারণগুলো ভাবি না। যখন দেখবেন, বাজারে গেলে আপনি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারছেন না, আর আপনারই একজন সহপাঠী আপনার থেকে কিছু সাধারণ জ্ঞান বেশি মুখস্থ করার কারণে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সুবাদে বিলাসিতায় মগ্ন, তখন আপনার কাছ থেকে ভালো গবেষণা বের হবে কী করে? বিগত তিন বছরের বিসিএসের রেজাল্ট দেখলে দেখবেন সেখানে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের জয়জয়কার। এটি শুধু বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের মর্যাদার ব্যাপার নয়, বরং একটা পেশাকে অতি আকর্ষণীয় করার কারণে ভবিষ্যতে দেশকে বিজ্ঞানী, শিক্ষক, গবেষক, ইঞ্জিনিয়ার ও চিকিৎসকশূন্যতার ভার বইতে হতে পারে।
ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুবাদে বলতে পারি, ভালো ছাত্ররা এখন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ছুটছে। কিন্তু সবাই তো বিসিএস ক্যাডার হতে পারে না। অন্যদিকে বিসিএস প্রিপারেশনের কারণে একাডেমিক কার্যক্রমে ঠিকভাবে মনোনিবেশ করতে পারে না– তখন সে দু’কূলই হারায়। এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা জিইয়ে রেখে কীভাবে আমরা অন্যের ভালো দেখে আক্ষেপ করতে পারি? খবরের কাগজ ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবর থেকে জানতে পারলাম, করোনাকালে বাংলাদেশের একজন গবেষক করোনার টিকা আবিষ্কার করেছিলেন এবং তা নাকি ডব্লিউএইচও কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছিল। সেই টিকা কেন আলোর মুখ দেখল না? তাহলে আমরা কেন আক্ষেপ করি?
বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুবাদে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু নিয়ে বিস্মিত হই। একটা প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে যদি ঘুষের লেনদেন হয় তাহলে যোগ্য লোক নিয়োগ পাবে কীভাবে? নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা যখন তাদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকেন তখন জনগণকে কীভাবে ভালো ও উন্নত সেবা দেওয়ার চিন্তা করবেন? আমি অনেক সামর্থ্যবান অভিভাবককে বলতে শুনেছি– সন্তানের চাকরির জন্য অর্থ জোগাড় করে রেখেছি; তাহলে তাদের সন্তান ভালো কিছু করবে কেন?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে বলছেন, চন্দ্রাভিযান আমাদের জন্য দরকার নেই বরং অপচয়। তাদের মতে, বাংলাদেশকে অন্যদিকে নজর দিতে হবে যেমন মানবসম্পদ উন্নয়ন, জাতীয় ও মাথাপিছু আয় বাড়ানো ইত্যাদি। তারা হয়তো এগুলো বলে নিজেদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আসলে আমি মনে করি, ‘শান্তিতে থাকা’ এবং ‘উন্নয়ন’ দুটি বিপরীতমুখী ধারণা। আমরা যদি শান্তি খুঁজি তাহলে কোনো কিছুর দরকার নেই। মনোবিদদের মতে– দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি, জেট বিমান– এগুলো শান্তির উপকরণ হিসেবে স্বীকৃত নয়। অপরদিকে, আমরা যদি উন্নয়ন চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই আক্ষেপের জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। অন্যের ভালো অর্জনে খুশি হতে হবে এবং নিজের যা সম্পদ ও সম্ভাবনা আছে সেগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। যোগ্যতা ও মেধার উপযুক্ত মূল্যায়ন করে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসাতে হবে। বাকিটা সময়ের ব্যাপার।
অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম: শিক্ষক, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]
- বিষয় :
- বিজ্ঞান
- মো. রবিউল ইসলাম
