আন্তর্জাতিক
ভারত-কানাডা সম্পর্কের ভাঙন কতদূর যাবে?
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকে কেন্দ্র করে ভারত-কানাডা সম্পর্কের উত্তেজনা এখন দৃশ্যমান হলেও টানাপোড়েন চলছিল আগে থেকেই। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ২০১৮ সালে তাঁর পরিবার নিয়ে সাত দিনের জন্য ভারত সফরে গিয়ে দেখেন, বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো ননই, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রীও তাঁকে স্বাগত জানাতে আসেননি। তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক নবীন মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং।
ট্রুডো ও তাঁর পরিবার তাজমহল দেখতে গেলে সেখানেও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শুভেচ্ছা জানাতে উপস্থিত ছিলেন না। নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাট সফরেও মোদি ছিলেন অনুপস্থিত। ভারত সফরকালে প্রথম দু’দিন তিনি মোদির সাক্ষাৎই পাননি। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান ভারত সফরে গেলে মোদি নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত হন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে তিনি বিমানবন্দরে গিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন। ট্রুডোর প্রতি ভারত সরকারের এমন আচরণ ও মনোভাবই বলে দেয় তাদের সম্পর্কের শীতলতার কথা। সেই সফরের শুরুতেই এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে এবং উভয় দেশের সংবাদমাধ্যমে আলোচনাও হয়। সর্বশেষ জি২০ শীর্ষ সম্মেলন তা আরও স্পষ্ট করে। প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করলেও ভারত তাতে রাজি হয়নি।
ডোর মন্ত্রিসভার ৩০ জন সদস্যের চারজনই ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিখ সম্প্রদায়ের। দেশটিতে বসবাস করা শিখদের অধিকাংশই আবার স্বাধীন খালিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। তাঁর কেবিনেটে যে চারজন শিখ মন্ত্রী আছেন, এর মধ্যে অন্তত দু’জন হরজিৎ সজ্জন ও অমরজিৎ সোধি প্রকাশ্যেই কানাডাতে খালিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছেন। সে সময় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কানাডা সরকারকে চিঠিও দিয়েছিলেন।
দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের এই বৈরী আচরণের জন্য দায়ী করা হয় কানাডা সরকারের শিখদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘খালিস্তান’ আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থনকে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কানাডা দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ ‘খালিস্তানি সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিদের’ আশ্রয় দিয়ে আসছে।’’
উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়ায় বোমা হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত শিখ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ওই সময়ের কানাডা সরকারের সম্পর্ক থাকার অভিযোগ ছিল। সেই হামলায় ৩২৯ জন নিহত হন।
সর্বশেষ ভারত-কানাডা সম্পর্ক ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ও অবনতির কারণ স্বাধীন খালিস্তান আন্দোলনের নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ড। গত ১৮ জুন কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো পার্লামেন্টে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথা প্রকাশ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা কনজারভেটিভ পার্টির পিয়েরে পলিয়েভও বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা কানাডার ‘সার্বভৌমত্বের অবমাননা’। তিনি ভারত সরকারকে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে সবচেয়ে আবেগময় বক্তব্য দেন কানাডার তৃতীয় বৃহত্তম দল এনডিপি নেতা জগমিত সিং। তিনি কানাডার প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের শিখ-কানাডিয়ান রাজনৈতিক নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা আছে। জগমিত পাঞ্জাবি ভাষায় বলেন, ‘আমি শিশুকালে শুনেছি যে, ভারত সরকার অনেক নৃশংস। কিন্তু আমরা কখনও ভাবিনি– কানাডায় আসার পরও তাদের সেই নৃশংস আচরণ আমাদের এখানেও তাড়া করবে; বিপদের সম্মুখীন করবে। আমি সবাইকে বলতে চাই, আমি এখানে আছি। আমার যতটুকু শক্তি আছে তার সবটা দিয়ে এই মামলার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করে যাব।’
এ ঘটনায় কানাডা ভারতীয় এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর মিশনপ্রধান পবন কুমার রাইকে বহিষ্কার করে। ভারতও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কানাডার এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। শুধু তাই নয়, কানাডা-ভারত সম্পর্কের অবনতির রেশ বাণিজ্যেও পড়ে। দুই দেশের মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। সর্বশেষ, কানাডার নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ধ করে দেয় ভারত।

কানাডা কেন ভারতের অভিযোগ আমলে নেয়নি? ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী কানাডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ। ভারতের পর কানাডাই হচ্ছে শিখ সম্প্রদায়ের বৃহত্তম নিবাস। কানাডার মোট জনসংখ্যায় খ্রিষ্টান ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ধর্মহীন ৩৪ দশমিক ৬, মুসলিম ৪ দশমিক ৯, হিন্দু ২ দশমিক ৩ এবং শিখ ২ দশমিক ১ শতাংশ। তবে দেশটিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যে শিখ সম্প্রদায়ের নাগরিকের অনুপাত সর্বোচ্চ। শিখদের সংখ্যা ৩৭ শতাংশ, দ্বিতীয় অবস্থানে হিন্দু ২৭, মুসলিম ১৭, খ্রিষ্টান ১৬ ও অন্যান্য ৬ শতাংশ। এ পরিসংখ্যানই বলে কানাডার রাজনীতিতে শিখদের শক্ত অবস্থানের কথা। এরা একটি সংগঠিত ভোট ব্যাংক। কানাডার প্রধান দলগুলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সমীকরণে শিখদের স্বার্থ, আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেয়। এ ছাড়া দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম দল এনডিপির সমর্থনে ট্রুডোর দল ক্ষমতায় আছে।
শিখ সম্প্রদায় কানাডার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলে রেখেছে। শিখদের এই প্রভাবশালী অবস্থা ভারত সরকারের জন্য অস্বস্তিকর। কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে দলগুলো শিখদের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিতে নারাজ। সেটা হলে ভারতের সঙ্গে কানাডার দীর্ঘ মেয়াদে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি সহজ নয়।
পাঞ্জাবের রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতার কারণেই এখানে শিখদের বৃহত্তম কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। প্রবল হয়েছে স্বাধীন খালিস্তানের স্বপ্ন । কানাডার ক্ষমতাসীনরা তাদের সেই আবেগের কতটা বিরোধিতা করবে, এ মুহূর্তে বলা কঠিন। যে কারণে ভারতের পক্ষ থেকে কানাডা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়দানের।
কে এই হরদীপ নিজ্জার সিং?
আশি-নব্বই দশকে পাঞ্জাবে ভারত সরকার ও শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে যে সশস্ত্র সংঘাত হয়, সে সময় নিজ্জারের পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়। নিজ্জার ১৯৯৭ সালে ভারত থেকে গোপনে কানাডা চলে যান। সেখানে তিনি স্বাধীন খালিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকেন। তিনি ছিলেন খালিস্তান টাইগার্স ফোর্স (কেটিএফ)-এর প্রধান পরিকল্পনাকারীদের একজন। কেটিএফকে ভারত সরকার সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০২০ সালে ভারত সরকার হরদীপ সিংকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয়। দেশটির ওয়ান্টেড তালিকায়ও তাঁর নাম আছে। তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি হত্যা ও নাশকতার মামলা ছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় ভারতীয় দূতাবাসে হামলায়ও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
শুধু হরদীপ নিজ্জারই নন; এ সময়ে তাদের আরও বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হয়েছেন। খালিস্তান কমান্ডো ফোর্সের নেতা পরমাজিত সিং নিহত হয়েছেন পাকিস্তানে; খালিস্তান লিবারেশন ফোর্সের নেতা অবতার সিং নিহত হয়েছেন ব্রিটেনের একটি হাসপাতালে। ড. হরমিত সিংসহ বেশ কয়েকজন নেতা বিভিন্ন সময় নিহত হন। গত ২০ সেপ্টেম্বর নিহত হলেন আরেক শিখ নেতা সুখদুল সিং। তিনিও ভারতের সন্ত্রাসবাদী তালিকায় ছিলেন। এসব হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও তারা সেগুলো অস্বীকার করছে এবং এগুলোর কোনোটা প্রমাণিত হয়নি; বরং তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব হত্যাকাণ্ড শিখদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে ঘটেছে।
ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি; দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। পশ্চিমাদের কাছে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রুডো তাঁর পশ্চিমা মিত্রদের কাছে ভারতের বিরুদ্ধে নালিশ করলেও তাদের উদ্বেগ, সহানুভূতি কতটা অর্জন করতে পারবেন, তা দেখার বিষয়। কারণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতকে তাদের দরকার।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- মঞ্জুরে খোদা
