ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাথাপ্রতি জলবায়ু ঋণ

বিপন্ন হইতে বিপন্নতর

বিপন্ন হইতে বিপন্নতর
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৪

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলির অন্যতম, আমরা জানিয়া আসিতেছি। এখন দেখা যাইতেছে, এই বাবদ শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশেও পরিণত হইয়াছে। জলবায়ু ঋণ ঝুঁকি সূচক-সিডিআরআই প্রকাশ উপলক্ষে শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনের এই তথ্য নিঃসন্দেহে যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী হইলেও বর্তমানে দেশের মাথাপিছু জলবায়ু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ মার্কিন ডলার। উপরন্তু বাংলাদেশের ঋণ-অনুদান অনুপাত স্বল্পোন্নত দেশগুলির তুলনায় প্রায় চার গুণ। আর বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এমডিবি হইতে গৃহীত ঋণের অনুপাত শূন্য দশমিক ৯৪, যাহা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় পাঁচ গুণ। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ ঋণ আকারে আসিবার কারণে বাংলাদেশের ন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলি এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে পতিত হইয়াছে। ইহাতে বলা হয়, জলবায়ু অর্থায়নের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে ঋণ হিসাবে, যাহা সংকটাপন্ন দেশগুলিকে দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে ফেলিতেছে। একদিকে দেশগুলি উপর্যুপরি জলবায়ুঘটিত বিপর্যয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে, অন্যদিকে ঋণের ক্রমবর্ধমান কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে উহাদের দ্বিতীয়বার ক্ষতির মুখে পড়িতে হইতেছে।

এই অবস্থায় জলবায়ু সহনশীলতার প্রচেষ্টা ব্যাপক অর্থ সংকটে পড়িবার কথা। বাস্তবে তাহাই ঘটিতেছে। প্রতিবেদনমতে, বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন খাতের বিনিয়োগ অনুপাত বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ৪২, যাহা স্বল্পোন্নত দেশগুলির গড় অনুপাতের অর্ধেকেরও কম। এই অর্থ সংকট এমন সময়ে চলিতেছে, যখন ২০০০ হইতে ২০২৩ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের ১৩ কোটিরও অধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত বা ক্ষতিগ্রস্ত। তাহাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াইয়াছে এক সহস্র ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলারে। অন্যদিকে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি স্ব-অর্থায়নে জলবায়ুঘটিত বিপর্যয় হইতে সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতিবৎসর মাথাপ্রতি গড়ে প্রায় ১১ সহস্র টাকা ব্যয় করিতে বাধ্য হইতেছে, যাহা জাতীয় পর্যায়ে বার্ষিক ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার।

মোদ্দাকথা, জলবায়ু অর্থায়নের নামে বৈশ্বিক পরিসরে বর্তমানে যেই ব্যবস্থা বিদ্যমান, তাহা বিপন্নকে বিপন্নতর করিয়া তুলিতেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা তো বটেই, যেই কোনো বিবেকবান মানুষের এই অন্যায় ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি জানাইবার কথা।

সম্ভবত সেই কারণেই অনুষ্ঠানে কপের ন্যায় বৈশ্বিক ফোরাম সম্পর্কে আলোচকদের অনেকে হতাশা প্রকাশ করিয়াছেন। তবে এহেন হতাশা প্রকাশ করিয়া হস্তপদ সংকুচিত করিয়া বসিয়া থাকিলে প্রকৃত অর্জন সম্ভবপর হইবে না। তজ্জন্য বিশ্বপরিসরে বিশেষত স্বল্পোন্নত ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির শিকার দেশগুলির সহিত ঐক্য গড়িয়া একটা ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়িবার পক্ষে জনমত তৈয়ার করিতে হইবে।

আলোচ্য গবেষণা প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঋণ বাতিল, তৎসহিত প্রকৃতি ও জলবায়ু সুরক্ষার বিনিময়ে ঋণ মওকুফ কার্যক্রম বৃদ্ধির যে দাবি উত্থাপিত হইয়াছে, উহা অত্যন্ত সংগত। তথায় বলা হইয়াছে, অভিযোজন খাতের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ এবং ক্ষয়ক্ষতি খাতের শতভাগ অর্থায়ন অনুদানরূপে আসিতে হইবে। শর্তহীনভাবে দেশীয় মালিকানায় জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্পে অর্থায়নকারীরূপে কার্বন প্রাইসিং এবং লেনদেন শুল্কের মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক অনুদান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিও গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডকে ‘বাংলাদেশ ন্যাচারাল রাইটস ফান্ড’-এ রূপান্তরের যেই দাবি জানানো হইয়াছে তাহাও গুরুত্বপূর্ণ। অধিকন্তু দেশে দৃঢ় অঙ্গীকার ও স্পষ্ট শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে তাগিদ প্রদান করা হইয়াছে, উহাও প্রণিধানযোগ্য। 

আরও পড়ুন

×