ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি

আত্মত্যাগের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা

আত্মত্যাগের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বৎসর পূর্ণ হইল। ২০২৪ সালের এই দিনে শিক্ষার্থী-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত এবং আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নূতন অধ্যায় সূচিত হয়। ঐ গণঅভ্যুত্থানে যাহারা মূল্যবাণ প্রাণ দিয়াছেন এবং আহত অবস্থায় বাঁচিয়া রহিয়াছেন, আজিকার দিনে আমরা তাহাদের আত্মত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতদের স্বজনদের বেদনা আমরাও ধারণ করি। 

ইহাও বলা প্রয়োজন, জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা সূচনা করিলেও ক্রমান্বয়ে ইহাতে যুক্ত হইয়াছিলেন সকল শ্রেণি-পেশা, ধর্ম ও নৃতত্ত্বের মানুষ। সূচনালগ্নে চাকুরিক্ষেত্রে বৈষম্য বিলোপের দাবি প্রধান হইলেও পরবর্তী সময়ে উহা সম্প্রসারিত হইয়াছিল রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণের অঙ্গীকারে। আর চূড়ান্ত পর্বে গণঅভ্যুত্থানকারীদে বক্ষে ছিল গণতন্ত্রের পথে নবযাত্রার স্বপ্ন। তাহারা ভাবিয়াছিলেন, রাজনীতির পালাবদলে শুধু অর্থনীতি চাঙ্গা হইবে না; লৈঙ্গিক, ধর্মীয়, জাতিগতসহ সকল প্রকার বৈষম্য হ্রাস পাইবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গঠিত হইবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ। সর্বোপরি, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হইবার পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পাইবে। কিন্তু সেই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়াইয়া আমরা কি দাবি করিতে পারি যে, আত্মদানকারী এবং আন্দোলনকারী জনতার সকল স্বপ্ন পূরণের পথে আমরা অগ্রসর হইতেছি?

খোদ অর্থমন্ত্রী একাধিকবার বলিয়াছেন, আমাদের অর্থনীতি বর্তমানে ভঙ্গুর দশায়। নূতন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হইতেছে না, বরং কলকারখানা বন্ধ হইবার কারণে অনেকে চাকুরি হারাইয়াছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের সহিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হইবার ফলস্বরূপ জনজীবনে ত্রাহি মধুসূদন রব উঠিয়াছে। ব্যাংক খাতের সহিত রাজস্ব আহরণও সংকটে জর্জরিত। কৃষক পূর্বের ন্যায় ফসলের ন্যায্যমূল্য হইতে বঞ্চিত; অন্যদিকে সরকারি ভ্রান্ত নীতির সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ভরা মৌসুমেও চাউলসহ প্রায় সকল কৃষিপণ্য উচ্চমূল্যে ক্রয় করিতে হইতেছে। খুন-ধর্ষণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাইবার কারণে জননিরাপত্তার সংকটও বৃদ্ধি পাইয়াছে।

জনসাধারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য উন্মুখ অপেক্ষায় ছিল– উহার মধ্য দিয়া অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের অবিমৃষ্যকারিতা হইতে রক্ষা পাইবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয়, উস্কানি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পৃষ্ঠপোষকতায় যেই মব সন্ত্রাস চালু হইয়াছিল, তাহার দাপট এখনও বন্ধ হয় নাই। সরকারি বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি-অনিয়মও বন্ধ হয় নাই। বরং ক্ষেত্রবিশেষে টিআইবির হিসাবে, পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পাইয়াছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারও কতখানি ন্যায়বিচারের পথে হাঁটিতেছে এবং কতখানি প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করিবার যত্রতত্র ব্যবহারযোগ্য হাতিয়ারে পরিণত হইয়াছে– সেই প্রশ্ন উঠিয়াছে। অধিকতর উদ্বেগের বিষয়, সকল সমস্যার জন্য এতদিন যেই বিভাজনের রাজনীতিকে দায়ী করা হইয়াছে, তাহা অদ্যাবধি বহাল। বিস্ময়কর হইল, যেই দলগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে গণঅভ্যুত্থানে শরিক হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যেও রেষারেষির রাজনীতি কদর্যরূপে দৃশ্যমান।

স্বীকার্য, সুষ্ঠু, অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাইতে পারিত। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক হইল না। উপরন্তু যেই রাজনৈতিক দলগুলি সম্মিলিতভাবে নির্বাচনকে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক হইতে দেয় নাই, তাহাদের মধ্যেই খোদ নির্বাচনের ফল লইয়া মতভেদ ঘটিতেছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল বলিতেছে, নির্বাচন প্রকৌশল ও ত্রুটিপূর্ণ ফল ঘোষণার মাধ্যমে তাহাদের ‘বিজয়’ ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছে। সরকারি দলের কতিপয় নেতার দাবি– বিরোধীদের বরং অনেক আসন ‘উপহার’ দেওয়া হইয়াছে। সংসদে বিরোধী দলের কণ্ঠে জনগণের কোনো দাবিই ভাষা পাইতেছে না। বরং উহারা সরকারি দলকে বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ছাড় দিয়া চলিয়াছেন। তাহাতে সংসদের কার্যকারিতা লইয়াও জনমনে সংশয় সৃষ্টি হইতেছে। এমতাবস্থায় ক্ষমতাসীনদের রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও পড়িয়াছে প্রশ্নের মুখে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আমাদের আকাঙ্ক্ষা, বিলম্বে হইলেও বিপুল আত্মত্যাগের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা পূরণে সকল গণতন্ত্রমনা দল ও শক্তি আন্তরিকতার সহিত আগাইয়া আসিবে।

আরও পড়ুন

×