ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা

নৈরাজ্য হইতে নৈরাশ্য

নৈরাজ্য হইতে নৈরাশ্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৯

রাজধানী ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে, তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। রবিবার সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশিত সংস্থাটির কিছু পরিসংখ্যান বলিতেছে, ঢাকায় ২০২০ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ১২৪, যাহা ২০২৫ সালে ছিল ৪০৭। অর্থাৎ তিন গুণের অধিক বৃদ্ধি পাইয়াছে। উক্ত সময়ে একই কারণে হতাহতের সংখ্যাও দুই গুণ বা ততোধিক বাড়িয়াছে। নিহত ও আহতের সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল ১২৬ ও ২৩৩; ২০২৫ সালে যেগুলি ছিল যথাক্রমে ২২৯ ও ৫১১। উপরন্তু এই বৎসরের প্রথম সাত মাসে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২২৩, ১৩৭ এবং ৩৫৬। স্পষ্টত, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত না হইলে বৎসর শেষে এই নগরী সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রে নূতন রেকর্ড গড়িতে পারে।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি প্রকাশিত ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্সের জরিপে ঢাকা তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহরের তকমা পাইয়াছে। অন্যদিকে, রবিবার প্রকাশিত সহযোগী এক দৈনিকে প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক সংস্থা নাম্বিওর ২০২৬ সালের অপরাধ ও নিরাপত্তা সূচকে ঢাকার অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এই সকল দিক বিবেচনায় লইলে রোড সেফটির প্রতিবেদনে বিস্মিত হওয়ার কোনো অবকাশ নাই। এই শহরটি বাসযোগ্যতা হারাইবার কারণ নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি গণপরিবহনের অপ্রতুলতা। কিন্তু পথচারীদেরও এখানে নিরাপত্তা নাই।

পরিসংখ্যানমতে, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি হইতে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এই শহরে এক সহস্র ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছেন এক সহস্র ৩৮৪ জন এবং আহত হইয়াছেন দুই সহস্র ৪৮৮ জন। নিহতদের মধ্যে পথচারী ৫৯২ জন, যাহা সর্বোচ্চ এবং মোট প্রাণহানির প্রায় ৪৩ শতাংশ; দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল মোটরসাইকেল আরোহীরা; সংখ্যায় যাহা ৫৩৬ (প্রায় ৩৯ শতাংশ)। 

বস্তুত সড়কে এহেন নৈরাজ্যের নেপথ্যে যানবাহনের অব্যবস্থাপনাই প্রধানত দায়ী। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে বলা হইয়াছে, বাইপাস সড়ক না থাকায় বিশেষত রাত ১০টা হইতে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া চলাচল করে। তদুপরি, দীর্ঘ সময় যানজটে আটকা থাকার কারণে যানবাহন চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটিতেছে, যাহার প্রধান শিকার হইতেছেন সড়ক পারাপারে রত পথচারীরা। দুর্ঘটনার সময় পর্যবেক্ষণ করিয়া সংস্থাটি বলিয়াছে, গত ছয় বৎসরে রাজধানীতে রাত্রে সবচাইতে বেশি নিহত হইয়াছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও দুর্ঘটনা বাড়িয়াছে। এই সকল যানবাহন যেমন ইচ্ছা চলিতেছে। প্রকৃতপক্ষে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির দায়িত্বহীনতাই এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়াছে বলা যায়। যাহার প্রতিফলন মহাসড়কগুলিতেও লক্ষ্য করা যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খোদ সড়ক পরিবহনমন্ত্রী স্বীকার করিয়াছিলেন, যানবাহন চালকদের অন্তত অর্ধেক সরকার অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্স ধারণ করে না। অনেকের ন্যূনতম প্রশিক্ষণও নাই। তখন সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং যানবাহন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত পুলিশের সহিত এক শ্রেণির অসাধু চালকের অশুভ আঁতাতের বিষয়ও ব্যাপক আলোচনায় ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেই সরকার যদ্রূপ ঐ সকল কিছুর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই, তদ্রূপ অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারও ঐ বিপজ্জনক স্থিতাবস্থা বজায় রাখাকেই শ্রেয় মনে করিয়াছে। তাহা না হইলে অন্তত গত দুই বৎসরে রাজধানীর সড়ক নিরাপত্তার কিছুটা হইলেও উন্নতি ঘটিত।

আমরা জানি, সড়ক দুর্ঘটনায় বহু পরিবার তাহদের একমাত্র উপার্জনকারীদের হারাইয়া থাকে, অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে বলিয়া সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলি একই পরিণতি বরণ করিতে বাধ্য হয়। অতএব, দুর্ঘটনার হার যে কোনো উপায়ে হ্রাস করিতেই হইবে। রাজধানীর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর যে পরামর্শ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দিয়াছে, তাহা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করাও জরুরি।

আরও পড়ুন

×