শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা
সহাবস্থান ও সহনশীলতা জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত কয়েক দিবস ধরিয়া দেশের ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যকার দফায় দফায় সংঘর্ষ উদ্বেগজনক। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার এই সংঘর্ষ এমন সময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি, যখন দেশব্যাপী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপিত হইতেছিল। সোমবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সূচিত এই সংঘাত মঙ্গলবার সম্প্রসারিত হয় ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায়। বরিশাল সরকারি বিএম কলেজ, রাজধানীর গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের ছাত্রশিবির কর্মীদের প্রহার করিয়া ক্যাম্পাস হইতে বিতাড়নের অভিযোগ উঠিয়াছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। বুধবারও নারায়ণগঞ্জে তোলারাম কলেজে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে। এহেন সংঘাতপূর্ণ তৎপরতায় আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ, শিক্ষাঙ্গন অস্থিতিশীল হইলে যদ্রূপ শিক্ষার্থীদের ক্ষতি, তদ্রূপ দেশের রাজনীতিতেও অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করে।
বস্তুত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য বিস্তার লইয়া সংঘাত ও সহিংসতা অনভিপ্রেত।
আমরা দেখিয়াছি, আওয়ামী লীগের সময়ে ছাত্রলীগ কীভাবে শিক্ষাঙ্গনে একচ্ছত্র আধিপত্য অর্জন করিয়া শিক্ষার্থীদের জিম্মি করিয়াছিল। আবাসিক হলে আসন নিশ্চিতকরণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে দলীয় কর্মসূচিকে প্রাধান্য দিতে হইত। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সেই জিম্মিদশার অবসান ঘটে এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। নূতন করিয়া সেইখানে দখলের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীরা চাহে না। আওয়ামী লীগ আমলের ন্যায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলির নিয়ন্ত্রণ লইয়া যদি সংঘাত জিইয়া রাখা হয়, তাহা হইলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে এত শিক্ষার্থী প্রাণ দিয়াছিল কেন?
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও সহনশীলতার কেন্দ্র হওয়া প্রত্যাশিত। সেইখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকিতেই পারে। কিন্তু তাহার সমাধান কখনও শক্তি প্রয়োগ, হামলা কিংবা প্রতিপক্ষকে ক্যাম্পাসছাড়া করিবার মাধ্যমে হইতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনক, অতীতের ন্যায় পুনরায় শিক্ষাঙ্গনে প্রভাব বিস্তার, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, প্রতিপক্ষ দমনের ‘সংস্কৃতি’ প্রত্যাবর্তনের শঙ্কা স্পষ্ট। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকিলে শিক্ষার পরিবেশ যদ্রূপ নষ্ট হইবে, তদ্রূপ ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মধ্যেও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করিবে।
আমরা মনে করি, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা ও দখলের চর্চিত সংস্কৃতি আর চলিতে পারে না। শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থান ও সকল সংগঠন নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালন করিতে পারিবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলগুলিও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকিতে হইবে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্যের যুগ আর ফিরাইয়া আনা যাইবে না। এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির সদিচ্ছা জরুরি। তাহাদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হইবে– ক্ষমতার নামে কিংবা সংগঠনের পরিচয়ে কোনো ধরনের সহিংসতা, দখলদারিত্ব বা প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হইবে না। তৎসহিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা লইতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নহে; অপরাধই হইতে হইবে বিচারের একমাত্র ভিত্তি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছুটা হইলেও সকল সংগঠনের সহাবস্থান আমরা দেখিতে পাইতেছি। এই পরিবেশ নষ্ট হইলে সংগত কারণেই উহার দায় ক্ষমতাসীন দলের উপরেই বর্তাইবে। তজ্জন্য বিএনপিকে বিষয়টি দায়িত্বশীলতার সহিত মোকাবিলা করিতে হইবে। শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণে শিক্ষাঙ্গনকে অবশ্যই সহিংসতার বাহিরে রাখিতে হইবে। তদপেক্ষা জরুরি হইল ছাত্র রাজনীতিকে উহার আপন গতিতে চলিতে দেওয়া। ক্ষমতাসীনদের লেজুড়বৃত্তি হইতে ছাত্র সংগঠনগুলিকে বাহির হইতে হইবে এবং প্রকৃত ছাত্রদের দ্বারাই সংগঠন পরিচালিত হইতে হইবে। প্রতি বৎসর প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হইবে, তবেই সহিংসতা ও দখলবাজির প্রবণতা হ্রাস পাইবে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়