ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

কাজের চেয়েও বেশি ক্লান্ত করে যানজট, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা 

কাজের চেয়েও বেশি ক্লান্ত করে যানজট, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা 
×

ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:০৬ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:০৬

সারাদিন কাজ করার পর বাড়ি ফেরার পথে যানজটে আটকে থেকে অনেকেই আরও বেশি ক্লান্ত ও বিরক্ত বোধ করেন। বিষয়টি শুধু মানসিক ধারণা নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যানজটে থাকা বা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর সময় মস্তিষ্ককে একটানা সতর্ক থাকতে হয়, অনিশ্চয়তা সামলাতে হয় এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। ফলে শারীরিক পরিশ্রম কম হলেও মানসিক ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে।

‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনুমানযোগ্য কাজের তুলনায় অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কে বেশি মানসিক চাপ বা কগনিটিভ লোড তৈরি হয়। যানজটের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, বারবার মনোযোগের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চাপ একসঙ্গে কাজ করায় পরিস্থিতি আরও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।

কেন যানজট এত ক্লান্তিকর

কর্মক্ষেত্রে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কাজ, সময়সূচি ও কাজ শেষ হওয়ার অনুভূতি থাকে। ইমেইলের উত্তর দেওয়া, প্রতিবেদন তৈরি করা কিংবা নির্ধারিত মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার মতো কাজের ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতে পারেন, কাজ কতটা এগিয়েছে এবং কখন শেষ হবে। কিন্তু যানজটে সেই নিশ্চয়তা থাকে না। গাড়ি কখন চলবে, কতক্ষণ পর গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে কিংবা সামনে হঠাৎ কী পরিস্থিতি তৈরি হবে—কিছুই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ফলে মস্তিষ্ককে বারবার সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুমান ও পুনর্মূল্যায়ন করতে হয়। গাড়ি চালানোর সময় প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরপর চারপাশের যানবাহন, পথচারী, ট্রাফিক সিগন্যাল, রাস্তার অবস্থা ও অন্য চালকদের আচরণের দিকে নজর রাখতে হয়। অর্থাৎ বিশ্রামের মতো মনে হলেও মস্তিষ্ক আসলে প্রায় পুরো সময়ই সতর্ক অবস্থায় থাকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব। যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় একজন চালক নিজের ইচ্ছামতো গতি বাড়াতে বা পথ পরিষ্কার করতে পারেন না। বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এই অবস্থায় হতাশা, বিরক্তি ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে।

মস্তিষ্কে কী ঘটে

দীর্ঘ সময় যানজট বা চাপপূর্ণ রাস্তায় থাকার সময় মস্তিষ্কের মনোযোগ-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে সক্রিয় থাকে। বিলম্ব, যানজট কিংবা অন্য চালকের আক্রমণাত্মক আচরণের মতো পরিস্থিতিতে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশও বেশি সক্রিয় হতে পারে। একই সঙ্গে চাপের পরিস্থিতিতে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় একটানা মনোযোগ ধরে রাখার পর স্মৃতি, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মানসিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও কমে যেতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো মূলত নিরাপদে গাড়ি চালানো ও সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলার জন্য শরীরের স্বাভাবিক ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই সতর্ক অবস্থায় থাকতে হলে যাত্রা শেষে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

কাজের চেয়ে পথ কেন বেশি ক্লান্ত করে

কাজের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও অগ্রগতির অনুভূতি মস্তিষ্ককে স্বস্তি দিতে পারে। একটি কাজ শেষ করা, ইমেইলের উত্তর দেওয়া বা কোনো দায়িত্ব সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে মানুষ বুঝতে পারেন যে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। যানজটে সেই অনুভূতি থাকে না। বরং একই জায়গায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকা, বারবার থেমে যাওয়া এবং অপ্রত্যাশিত বিলম্ব মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সুযোগ দেয় না। ফলে কোনো দৃশ্যমান কাজ না করেও একজন মানুষ প্রচুর মানসিক শক্তি ব্যয় করতে পারেন।

দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব

প্রতিদিনের যাতায়াত যদি দীর্ঘ ও চাপপূর্ণ হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু সাময়িক ক্লান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। নিয়মিত যানজটের চাপের কারণে কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ, মানসিক সহনশীলতা কমে যাওয়া এবং ঘুমের ব্যাঘাত দেখা দিতে পারে। কারও আগে থেকেই উদ্বেগ বা মাইগ্রেনের সমস্যা থাকলে দীর্ঘস্থায়ী যাতায়াতের চাপ এসব উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শরীরের স্ট্রেস রেসপন্স সক্রিয় থাকলে ঘুমের মান খারাপ হওয়া এবং সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

কীভাবে চাপ কমানো যায়

যানজট পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও এর মানসিক প্রভাব কিছুটা কমানো যায়। যাতায়াতের সময় তাড়াহুড়া কমাতে হাতে অতিরিক্ত সময় রাখা, গাড়িতে শান্তিদায়ক সংগীত বা শিক্ষামূলক অডিও শোনা এবং আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসার পরামর্শ দেওয়া হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর পরপরই কঠিন কোনো কাজে না গিয়ে কয়েক মিনিট নিজেকে সময় দেওয়াও উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস মস্তিষ্ককে দৈনন্দিন চাপ মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যানজটে আটকে থাকলে বাইরে থেকে মনে হতে পারে মানুষ কোনো কাজই করছেন না। কিন্তু ওই সময় মস্তিষ্ককে ক্রমাগত সতর্কতা, অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে থাকতে হয়। এ কারণেই অনেকের কাছে সারাদিনের কাজের চেয়েও দীর্ঘ যানজটের পথ বেশি ক্লান্তিকর মনে হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি

 

আরও পড়ুন

×