শিক্ষক বরখাস্ত, তদন্ত ও তালিকা
তদন্তের মোড়কে প্রতিহিংসা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যেই ধরনের শাস্তিমূলক তৎপরতা চলিতেছে, উহা কার্যত নজিরবিহীন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এইভাবে ‘সংঘবদ্ধ ব্যবস্থা’ উদ্বেগজনক। সোমবার প্রকাশিত সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষক বরখাস্ত, তদন্ত ও তালিকা ঘিরিয়া ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈয়ার হইয়াছে। এই অবস্থায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম সংকটে পড়িবার উপক্রম। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী মব সন্ত্রাসের শিকার হইয়াছিলেন। নির্বাচিত সরকারের সময়ও ‘তদন্তের মোড়কে’ সেই ধারা অব্যাহত থাকিবে কেন?
কোনো শিক্ষক অপরাধ করিলে অবশ্যই তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা লওয়া যাইতে পারে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্বিচার বা সংঘবদ্ধভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে। বিশ্ববিদ্যালয় হইল মুক্ত ও স্বাধীন জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক সেইখানে কেবল পাঠদান করিয়া থাকেন না; গবেষণা, মতপ্রকাশ, যুক্তিবোধ ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়া থাকেন। ফলে শিক্ষকদের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়রানি কিংবা শাস্তির আওতায় আনা হইলে উহার প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপর পড়ে না; সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়কেই প্রভাবিত করে। শিক্ষকরা যদি অনিশ্চয়তা, ভয় বা প্রতিহিংসার আশঙ্কায় থাকেন, তাহা হইলে স্বাধীনভাবে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হইতে বাধ্য।
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ২২ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতায় যুক্ত থাকিবার অভিযোগ আনিয়া গত কয়েক দিনে পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হইয়াছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এহেন কমিটি গঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্প্রতি কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইয়াছে। কোন এখতিয়ারে বিশ্ববিদ্যালয় এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে– সেই প্রশ্ন ইতোমধ্যে উঠিয়াছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা প্রণয়ন এবং তদন্ত কমিটির কার্যক্রম লইয়া উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। শিক্ষকদের সংগঠনটি যথার্থই বলিয়াছে, অভিযোগ প্রমাণের পূর্বেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার পরিপন্থি।
ইহার অর্থ এই নহে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক দায়মুক্ত থাকিবেন। অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা কিংবা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ থাকিলে উহার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তবে তদন্তের পূর্বেই অপরাধীরূপে চিহ্নিতকরণ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা অতীত ভূমিকার ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। শিক্ষকদের মতপ্রকাশ কিংবা যে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণের স্বাধীনতা রহিয়াছে। রাজনৈতিক কারণে তালিকা করিয়া তাহাদের হয়রানি যদ্রূপ আইনসিদ্ধ নহে, তদ্রূপ শিক্ষকের মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপের শামিল।
অস্বীকার করা যাইবে না, রাজনৈতিক কারণে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বিএনপি-জামায়াতপন্থি তথা বিরোধী মতাদর্শের শিক্ষকরা নানামুখী হয়রানির স্বীকার হইয়াছেন। তাই বলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সেই প্রতিশোধের সংস্কৃতি চলিতে পারে না। রাজনৈতিক পালাবদলের সহিত শিক্ষকদের ‘পক্ষ’ ও ‘বিপক্ষ’রূপে চিহ্নিতকরণের সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সরকার বা দলের প্রতিষ্ঠান নহে। জ্ঞান, গবেষণা ও মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠান হিসাবে এইখানে প্রতিহিংসাপরায়ণতা চলিতে পারে না। তজ্জন্যই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যে কোনো ব্যবস্থা হইতে হইবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও ন্যায়সংগত। এইভাবে সংঘবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়