দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ
সেউতা সংকট বুঝিয়ে দিল ইউরোপকে বিভক্ত করা কতটা সহজ
ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
পল টেলর
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ২২:০৫ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৩৭
গত ৩০ জুলাই মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসী সমুদ্র সাঁতরে স্পেনের সেউতায় পৌঁছার ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২২ নেতা, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েল সরকার একযোগে স্পেন সরকারের সমালোচনা শুরু করে।
দোষারোপের এই প্রতিযোগিতা একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতির একটি নমুনা হতে পারে, যেখানে সামাজিক মাধ্যমের রিয়েল-টাইমের ইকো-চেম্বারে জনতুষ্টিবাদী নেতারা ক্রমাগত ভয় দেখিয়ে বা উসকানি ছড়িয়ে মূল আলোচনার গতিপথ ঠিক করে দেন। সেউতা ইস্যুতে ইইউ মিত্রদের তাৎক্ষণিক ও অপরিণামদর্শী প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে পারস্পরিক আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারকে ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা রুখে দিতে ইইউর সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেও বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্স স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে আক্রমণ করার এই সুযোগ গ্রহণ করবেন- তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বলা হচ্ছে, ১০ লাখের বেশি অভিবাসীকে আইনি মর্যাদার জন্য আবেদনের সুযোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অনুপ্রবেশকে ‘আমন্ত্রণ’ জানিয়েছেন। তবে এমন অভিযোগ কেবল অভিবাসী ইস্যুতে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের সঙ্গেই মেলে।
ইইউর যেসব নেতা ইউরোপীয় কমিশনকে চিঠি দিয়ে স্পেনের সমালোচনা করেছেন, তাদের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত- এই আচরণ কীভাবে একটি সমন্বিত অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নে ইইউকে সাহায্য করবে? ওই নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধে ভণ্ডামির অভিযোগ তোলা হয়ত অযৌক্তিক হবে না। কারণ জার্মানি ও ইতালি, উভয়ই শ্রমিক সংকট মেটাতে এরইমধ্যে লাখ লাখ অভিবাসীবাসীকে আইনি বৈধতা দিয়েছে।
২০২১ সালে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়া যখন বেলারুশ থেকে আসা অভিবাসীদের তোপের মুখে পড়ে, তখন ইইউ তার পূর্ব ইউরোপীয় সদস্যদের পাশে দাঁড়ায়। এমনকি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বাস্তুচ্যুতদের ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে মিনস্কের একনায়কতান্ত্রিক সরকারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইইউ। এর আগের বছর, তুরস্ক থেকে গ্রিস সীমান্তে অবৈধ অভিবাসীর ঢল ঠেকাতে ইইউ তার সীমান্ত রক্ষী সংস্থা ‘ফ্রন্টেক্স’ পাঠায়। ওই অনুপ্রবেশে আঙ্কারার প্রত্যক্ষ উসকানি ছিল বলে মনে করা হয়।

আর এবার সেউতা ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো অভ্যন্তরীণ দোষারোপের খেলায় ব্যস্ত। হয়তো তারা ২০১৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপীয় সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা মনে করে আতঙ্কে শিউরে উঠেছিল। ওই সময় ১০ লাখের বেশি শরণার্থী (বেশিরভাগই সিরীয়) ইইউতে প্রবেশ করে।
তবে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করলেও ইউরোপীয় নেতা কিংবা ইউরোপীয় কমিশন- কেউই মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস দেখালেন না! অথচ, ‘স্পেনের সীমান্ত সবার জন্য উন্মুক্ত’- এমন ভুয়া খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যখন সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় আসে, তখন মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখেন।
ঘটনাটি ঘটে মরক্কোর বার্ষিক ‘সিংহাসন দিবসে’ (থ্রোন ডে)। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ দ্বীপ ভূখণ্ড সেউতা ও মেলিলার ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন না। তাছাড়া, ওই সময় তিনি মরক্কোর উত্তরাঞ্চলীয় শহর তেতুয়ান সফর করছিলেন, যা একসময় স্প্যানিশ উপনিবেশের অংশ ছিল। অনেকে সেউতা অভিমুখে হাজার হাজার মানুষের পদযাত্রাকে ‘ব্লু মার্চ’ আখ্যা দিয়েছেন, যা ১৯৭৫ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের বাবা দ্বিতীয় হাসানের সময়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রিন মার্চ’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। সেসময় স্প্যানিশ উপনিবেশ ‘পশ্চিম সাহারা’ দখল করার উদ্দেশ্যে ওই পদযাত্রা হয়।
‘মরক্কোয় কোনো কিছুই কাকতালীয়ভাবে ঘটে না’- বলে মন্তব্য করেছেন মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ও স্পেনের সাবেক অভিবাসন বিষয়ক সচিব আন্না তেরন কুসি। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেখে সেউতা অভিমুখে মানুষের ঢল শুরু হলেও তিনি মনে করেন, ‘এর একাধিক অনুঘটক রয়েছে। অভিবাসন সংকটের চেয়ে এটি অনেক বেশি ভূ-রাজনৈতিক সংকট।’ ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি যে সানচেজের বিরুদ্ধে এই আক্রমণে নেতৃত্ব দেবেন- তাতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। তিনি কট্টর-ডানপন্থি দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’র প্রধান এবং আগামী বছরের নির্বাচনে অবসরপ্রাপ্ত এক জেনারেলের নেতৃত্বাধীন আরও উগ্র-ডানপন্থি দলের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্পেন ও ব্রিটেনের অভিবাসনবিরোধী বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ সেলফি তুলতে সেউতায় ছুটে গেছেন। রিফর্ম ইউকের এক নেতা তো সৈকতে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করেন, ‘এটি বিদেশি আক্রমণ’।
সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল, ডেনমার্কের মধ্য-বামপন্থী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের আচরণ। তিনি মেলোনির সঙ্গে যৌথভাবে ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনকে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এবং বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত স্পেনকে শেনজেন ভিসামুক্ত সীমান্ত অঞ্চল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা। পরে ইইউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের তড়িঘড়ি ভিডিও কনফারেন্সে অবশ্য সংহতির একটি বাহ্যিক রূপ ফিরিয়ে আনা হয়। ততক্ষণে সেউতায় আসা অভিবাসীরা বুঝতে পারেন, ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছার সুযোগ আর নেই। ফলে তারা মরক্কোয় ফিরতে শুরু করেন।
ইতালি ও স্পেন এখন একে অপরের নাগরিকদের পাসপোর্টের ওপর কড়াকড়ি আরোপের পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ে লিপ্ত। আর এই ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ স্পষ্ট দেখে নিলেন- অভিবাসীরা সৈকতে সামান্য পা রাখলেই ইউরোপ কতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং নিজেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়।
অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে কিংবা স্রেফ বিদ্বেষবশত, ইইউর কয়েকজন মন্ত্রী অভিবাসীদের আইনি বৈধতা দেওয়ার বিষয়ে স্পেনের নীতির বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা দাবি করেন, এটি গণ-অভিবাসনকে উৎসাহিত করেছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তো একধাপ এগিয়ে দাবি করে বসেন, কেবল কাজের ভিসা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বরং ইউরোপীয় নাগরিকত্ব বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ ‘প্রিজনার্স ডিলেমা’ বা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘যৌথ উদ্যোগ সংকটের’ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। শেনজেন অঞ্চলে অবাধ যাতায়াত টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাদের গভীর স্বার্থ রয়েছে। অর্থনীতি সচল রাখতে সীমান্ত উন্মুক্ত তাদের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার ঠেকাতে শক্ত সীমান্ত এখন সময়ের দাবি। সংকুচিত হতে থাকা ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য অভিবাসীদের কাজের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
এমন বাস্তবতার মধ্যেও সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা বা অভিবাসনবিরোধী কট্টর অবস্থান নিয়ে সস্তা বাহবা কুড়ানোর জন্য ইউরোপের অনেক দেশ বারবার তাদের ঐক্যকে নিজের হাতেই ধ্বংস করছে।
লেখক: ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো