ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

চিকিৎসাধীন বন্দির হাতকড়া

অমানবিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন

অমানবিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের পরিবর্তন হইলেও গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরানোর ন্যায় অমানবিক ও সংবিধানবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ হইল না। সম্প্রতি কারাবন্দি পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মনির খানকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আইসিইউ) হাতকড়া পরাইয়া রাখিবার ঘটনায় এমন দুর্ভাগ্যজনক চিত্রই ফুটিয়া উঠিয়াছে। রোববার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, কাশিমপুর কারাগারে স্ট্রোকের পর গুরুতর অসুস্থ মিজানুর রহমানকে হাতকড়া পরাইয়া বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরাইয়া ১৪ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে লওয়া হয়। পরদিন লওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। এই অবস্থায়ই গত ৫ আগস্ট তাঁহার মৃত্যু ঘটে। একজন রাজনৈতিক বন্দির সহিত পুলিশের এহেন নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণে স্বাভাবিকভাবেই সচেতন মহলে নিন্দার ঝড় উঠিয়াছে। দুঃখজনক হইলেও সত্য, আওয়ামী লীগের আমলে যদ্রূপ চিকিৎসাধীন বন্দিদের বেড়ি ও হাতকড়া পড়াইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। তদ্রূপ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উহার পুনরাবৃত্তি হইয়াছে এবং বর্তমান বিএনপির সময়ও একই প্রবণতা দৃশ্যমান।

২০২২ সালে গ্রেপ্তারকৃত গাজীপুরের বিএনপি নেতা আলী আজম খানকে মায়ের জানাজায় অংশ লইতে হয় ডান্ডাবেড়ি পরিহিত অবস্থায়। অনুরোধের পরও তাঁহার হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পুলিশ খুলিয়া দেয় নাই। অনুরূপ ২০২৩ সালে যশোরের যুবদল নেতা ও কলেজ শিক্ষক আমিনুর রহমান মধুকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরাইয়া রাখা হইয়াছিল। এমনকি খাওয়ার সময়ও হাতকড়া খুলিয়া দেওয়া হয় নাই। ইহার পর উচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করিয়া পুলিশের এহেন আচরণকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হইবে না এবং ডান্ডাবেড়ি পরাইবার বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হইবে না– এই মর্মে রুল জারি করেন। কিন্তু হতাশার বিষয়, অদ্যাবধি উক্ত রুলের নিষ্পত্তি হয় নাই। বিশেষত প্রতিপক্ষভুক্ত রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণও বন্ধ হয়নি। উল্লেখ্য, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে আসামির সঙ্গে নিষ্ঠুর বা অমানবিক আচরণ না করিবার বিষয়ে বলা হইয়াছে।

পুলিশ প্রবিধানের ৩৩০ ধারায় বলা হইয়াছে, কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট বা তদন্তস্থলে পাঠাইবার সময় পলায়ন রোধে বন্দির সহিত যাহা প্রয়োজন, ততোধিক কড়াকড়ি করা উচিত নহে। উপরন্তু হাতকড়া বা রশির ব্যবহার প্রায় ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় ও অমর্যাদাকর। উহাতে আরও বলা হইয়াছে, বয়স বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে যাহাদের নিরাপত্তা রক্ষা করা সহজ ও নিরাপদ, তাহাদের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত নহে। কিন্তু গত বৎসরের সেপ্টেম্বরে ৭৫ বৎসর বয়সী কারাবন্দি প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন  হাসপাতালে যখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান, তখনও তাঁহার হাতকড়া ছিল। জনপরিসরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পুলিশ ছবিটিকে পুরাতন বলিলেও উহা যে ভুক্তভোগীর চিকিৎসা চলাকালে তোলা– এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।

স্বীকার্য, এই ন্যক্কারজনক প্রথা দীর্ঘদিন যাবৎ বহাল থাকিবার প্রধান কারণ দেশের কারা ব্যবস্থাপনা এবং জেল কোড সংস্কার না হওয়া। তবে রাজনৈতিক দলগুলির সদিচ্ছার অভাব যে এই অচলায়তনের প্রধান কারণ, ইহাও স্পষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলি বিরোধী দলে থাকাকালে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি যতটা নৈকট্য অনুভব করে, ক্ষমতাসীন হইলে সেইগুলি হইতে ততোধিক দূরত্ব বজায় রাখে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাইয়া নির্বাচিত বর্তমান সরকারের নিকট প্রতিশ্রুতির এহেন বরখেলাপ অগ্রহণযোগ্য। আলোচ্য অপসংস্কৃতির অবসান ঘটাইতেই হইবে। উচ্চ আদালতকেও তাহার
এতৎ-সংক্রান্ত পূর্বের নির্দেশনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করিতে হইবে। সর্বোপরি সচেতন মহলেরও উক্ত বিষয়ে সোচ্চার থাকা জরুরি।

আরও পড়ুন

×