সড়ক দুর্ঘটনা
চালকের 'ডোপ টেস্ট' যেভাবে কার্যকর হতে পারে
গোলাম শওকত হোসেন
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৪:৩১
মদ, বিয়ার বা চেতনানাশক কোনো ওষুধ ডাক্তারি শাস্ত্রের নির্দেশিত মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ করে কোনো যানবাহন চালানোকে ডিইউআই বা ড্রাইভিং আন্ডার ইন্টক্সিকেসন বলে। এর সঙ্গে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, এর একটি আরটিএ তথা রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট অর্থাৎ রাস্তায় চলন্ত যানবাহনের সঙ্গে অন্য যানবাহন, মানুষ, প্রাণী, গাছ বা স্থাপনার সঙ্গে সংঘাত হওয়া বা করা অথবা রাস্তা বা পথচ্যুত হয়ে যানবাহনের, জীবনের, সম্পদের নাশ, ক্ষতি সাধন হওয়া বা করা। আর ডোপ টেস্টও এখানে প্রাসঙ্গিক। ডোপ টেস্টের মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়, কারও শরীরে মাত্রাতিরিক্ত মদ, বিয়ার বা ওষুধ আছে কিনা যা দিয়ে নির্ণয় করা যায়, সে স্বাভাবিক-সুস্থ কর্মকাণ্ড করতে সক্ষম বা অক্ষম।
বাংলাদেশের যানবহন চালকদের অনেকেই সাধারণত মদ, বিয়ার, গাঁজা, কাশির ওষুধ ফেনসিডিল, ইয়াবা, আফিম, হেরোইন, কড়া জর্দা দিয়ে পান, সাদা পাতা, ঘুমের ওষুধ প্রভৃতি গ্রহণ করে গাড়ি চালায়। অনেকে যেমন ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালায়, আবার অনেকে ড্রাইভিং পরীক্ষা না দিয়ে লাইসেন্স পায়। ভয়মুক্ত থাকতে নেশার চাপে চালকরা উত্তেজক দ্রব্য সেবন করে। তা ছাড়া উত্তেজক দ্রব্য সেবনের পরও তাদের পার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যেহেতু পথে পথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ডিইউআই প্রমাণ করার আধুনিক প্রযুক্তি নেই। তা ছাড়া এগুলো সহজলভ্য। প্রেসক্রিপশন বা আইডি ছাড়া অর্থের বিনিময়েই মদ, বিয়ার, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, আফিম, হেরোইন, কড়া জর্দা দিয়ে পান, সাদা পাতা, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি কিনতে পাওয়া যায়। যারা এসব দ্রব্য সেবন করে অনেকক্ষেত্রে সড়কে তাদের হাতেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। ১৯৯৫ সালে ন্যাশনাল রোড সেফটি কাউন্সিল গঠিত হয়। যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে- বিআরটিএ, বাংলাদেশ পুলিশ, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে ডিপার্টমেন্ট, ট্রান্সপোর্ট ওনার্স ও ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং নানা পেশাজীবী। তাদের সুপারিশে সরকারের ডোপ টেস্টের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য শুধু হসপিটাল ভিত্তিক ডোপ টেস্টের সনদের সঙ্গে সঙ্গে সিটি ও হাইওয়েতেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছেও ডোপ টেস্টের প্রাথমিক সরঞ্জামাদি থাকা উচিত।
ড্রাগ বা উত্তেজক বস্তুগুলো নানা ভাগে ভাগ করা যায়- সলিড, লিকুইড ও বায়বীয়, পানিতে দ্রবণীয় ও চর্বিতে দ্রবণীয়, লং-একটিইং ও শর্ট-একটিইং, ফরমুলেশন (কী কী মিশিয়ে বানানো) ইত্যাদি। ড্রাগ বা উত্তেজক বস্তুগুলোর তীব্রতা নির্ভর করে- গ্রহণের মাত্রা, গ্রহণের পদ্ধতি ও ড্রাগের ক্ষমতার ওপর ইত্যাদি। বর্তমানে ডোপ বা নোপ টেস্ট সারা পৃথিবীতে দুই ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত- ট্রাফিক আইনে আর আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে। এই টেস্টকে কেউ যাতে ফাঁকি দিতে না পারে সে জন্য কঠোর প্রটোকল মানতে হয়, প্রটোকলে বাধা দিলে বা না মানলে আইনানুযায়ী তাকে ফেইল বা পজিটিভ বলে ধরে নেওয়া হবে। কনসেন্ট ফরমে সই করতেই হবে। টেস্টের জন্য ইউরিন স্যাম্পল সংগ্রহের নির্দিষ্ট স্থানে খালি হাতে, খালি পকেটে, প্রয়োজনে শুধু শর্টস পুরুষের বেলায় এবং নারীদের বেলায় শর্টস বা ট্রাউজার এবং স্পোর্টস ব্রা বা ব্লাউজ পরে ঢুকতে হবে। পুরুষকে একজন পুরুষ বডি সার্চ করবে ও নারীকে একজন নারী বডি সার্চ করবে, যাতে তাদের শরীরে লুক্কায়িত কোনো কিছু না থাকে এবং ইউরিন সংগ্রহের সময় পুরুষের জন্য পুরুষ ও নারীর জন্য নারী খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে। পরে স্যাম্পল সামনাসামনি নির্ভুলভাবে লেভেলিং করে ল্যাবে পাঠানো হবে।
ডিইউআই সন্দেহ হলে পুলিশ সাধারণত ছয়ভাবে ফিজিক্যাল টেস্ট করে, যাকে বাংলায় বলে, খোলা স্থানে প্রমিত সংযম পরীক্ষা- এক পায়ে ৩০ সেকেন্ড করে দাঁড়িয়ে থাকা, লম্বা দাগ বরাবর এক পায়ের আগার সঙ্গে অন্য পায়ের গোড়ালিকে লাগিয়ে হাঁটা, দুই হাত দু'দিকে প্রসারিত করে পর্যায়ক্রমে দুই হাতের তর্জনী দিয়ে নাক স্পর্শ করা, পুলিশের হাতের তর্জনীকে লক্ষ্য করে দুই চোখ ওপর-নিচ ও ডান-বাঁ করা, বোর্ডে এলোমেলোভাবে ইংরেজি বা বাংলায় লেখা অক্ষরগুলো পড়া, বোর্ডে এলোমেলোভাবে ইংরেজি বা বাংলায় লেখা সংখ্যাগুলো পড়া ইত্যাদি। অন্যটি ব্রেথএনালাইজার টেস্ট- মুখে মদ বা তাড়ি বা কোনো কেমিক্যাল জাতীয় উত্তেজকের গন্ধ পাওয়া গেলে ডিভাইসে ফুঁ দিয়ে প্রশ্বাস দেওয়ার পর ডিভাইসের বোতামে চাপ দিলে অ্যালকোহল বা কেমিক্যাল ডোপ টেস্ট পজিটিভ বা নেগেটিভ তা ধরা পড়ে যায়। বর্তমান পৃথিবীতে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণানুযায়ী গড় আয়ুর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্টসমৃদ্ধ পৃথিবীর ১৮৩টি দেশের মাঝে বাংলাদেশের স্থান ১০৬-এ। গড়ে আমাদের দেশে বছরে অ্যাক্সিডেন্টে ১২,০০০ জন মারা যান আর ৩৫,০০০ জন আহত হন স্বাভাবিক অবস্থায়। এই পরিসংখ্যান থেকে আমাদের শিক্ষাগ্রহণ করে মাদকাসক্ত ড্রাইভিংকে জিরো টলারেন্সে আনতে হবে। সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এর ইতিবাচক ফলাফল নির্ভর করবে আমাদের ওপর (জনগণের) এবং বিশেষ করে এ কাজে সংশ্নিষ্ট সবার দায়িত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, নিষ্ঠা ও সততার ওপর।
ডা. গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক ও শিক্ষক
- বিষয় :
- সড়ক দুর্ঘটনা
- গোলাম শওকত হোসেন
