ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি যেন আবার না ফেরে

ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি  যেন আবার না ফেরে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো ছিল ভয়ের সংস্কৃতির সূতিকাগার। আর এই ভয়ের সংস্কৃতিই ছিল ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান। ক্যাম্পাসগুলোতে আবাসিক হলের গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করা হতো। ফ্যাসিবাদী সেই ভয় প্রতিরোধ করেই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই হয়েছিল জুলাই আন্দোলন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, জুলাইয়ের ঐক্য নানাভাবে বিনষ্ট হয়েছে, যার ঢেউ ক্যাম্পাসগুলোতে এসে লেগেছে। নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি শুরু হয়েছে এবং প্রতিরোধের শক্তি বিভক্ত ও দুর্বল হয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের। গতকাল শনিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরে সংগঠনটি। আলোচনায় অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনসহ ১৩ শিক্ষক। এ ছাড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীও আলোচনায় অংশ নেন। 

আলোচনার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী। আলোচনায় তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯ শতাংশ সমস্যা শিক্ষকদের কারণে। শিক্ষকরা উচ্চাভিলাষ বা রাজনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে কাজ করলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতির দিকে যাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইউজিসির সদস্য ছিলেন ঢাবি অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, ‘নিপীড়ন শুধু মানসিক কিংবা শারীরিক নয়, নিয়োগেও (শিক্ষক নিয়োগ) নিপীড়ন আছে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত পরীক্ষার নামে প্রহসন হয়েছে।’
জোর যার মুল্লুক তার– ৫ আগস্টের পরও এই মানসিকতা রয়ে গেছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। তিনি বলেন, সবকিছুর পেছনে ব্যক্তি বা মুষ্টিমেয় স্বার্থ কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরপেক্ষ হলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

অভ্যুত্থানের পরের বাস্তবতা সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ধীমান সরকার বলেন, একটা মহলের মতাদর্শের বিরুদ্ধে গেলেই বট (ভুয়া পরিচয়ে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার চালানো) আক্রমণ শুরু হয়। অনলাইনে মব তৈরি করে সেটাকে বাস্তবেও নিয়ে আসা হচ্ছে।

বেসরকারি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামা ভট্টাচার্য বলেন, অভ্যুত্থানের পর ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করলেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের হেনস্তা করার চর্চা দেখা গেছে। 
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের শিক্ষক নেটওয়ার্কের আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজনীতিকরণ চলেছে, পাশাপাশি পরমতসহিষ্ণুতার অভাব দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে চলবে, তা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল থেকে একটি গোষ্ঠী ঠিক করতে শুরু করে। সেই গোষ্ঠী ছাত্রশিবির বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জারিন তাসনিম বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনিসহ নারী শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষকের কাছ থেকে নোংরা কথার শিকার হন। ওই শিক্ষকের শাস্তি দাবি করতে গিয়ে তিনি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়েছেন।
গোলটেবিল আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। সবার আলোচনা শেষে হওয়ার পর বক্তব্যে তিনি বলেন, গত ২০-২১ মাসে একটা যথেচ্ছাচারের রাজত্ব দেখা গেছে। এই যথেচ্ছাচারটি শিক্ষকদের এবং বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে আরও বেশি সংকুচিত করে ফেলেছে। একদিকে ছাত্রদের কাছ থেকে মবের ভয়, অন্যদিকে প্রশাসন কীভাবে হেনস্তা করবে তার ভয়। তার সঙ্গে আছে সাইবার স্পেসে বুলিংয়ের শিকার হওয়ার ভয়। অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, সেটা একটা আশঙ্কার বাস্তবতা।

আরও পড়ুন

×