শিক্ষক বদলিতে গণ্যমান্য ব্যক্তি প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলির কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইনের পরিবর্তে আবার ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে (অফলাইন) ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বাধীন চার স্তরের কমিটির মাধ্যমে বদলির আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে। কমিটিতে দুজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
শিক্ষকদের অনেকের আশঙ্কা, স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ব্যবস্থার পরিবর্তে কমিটিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে বদলি প্রক্রিয়ায় অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির, ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতি আবার ফিরে আসবে।
অফলাইন বদলি ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, তদবির, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে প্রকৃত যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বঞ্চিত হতেন বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে চালু করা হয় অনলাইন বদলি কার্যক্রম। তবে গত ২১ জুন সরকার অনলাইন বদলি নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন করেও শেষ পর্যন্ত অফলাইন পদ্ধতিতে বদলি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বদলি প্রক্রিয়া চার স্তরে সম্পন্ন হবে। বদলির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবর্তে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওর নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন কমিটির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কমিটিতে দুজন করে বহিরাগত গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধান নিয়ে শিক্ষকদের আশঙ্কা, সরকারি বদলি প্রক্রিয়ায় বেসরকারি ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়াবে এবং অতীতের মতো ঘুষ, তদবির ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়বে।
চার স্তরের কমিটিতে হবে বদলি
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নের জন্য জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা (বা থানা) পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জাতীয় কমিটির সভাপতি থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়)। এ কমিটি আন্তঃবিভাগীয় বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি করবে এবং প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করে প্রতিবেদন মন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠাবে।
বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে বিভাগীয় উপপরিচালক (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা), বিভাগীয় উপপরিচালক (প্রাথমিক শিক্ষা) এবং সভাপতির মনোনীত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য হিসেবে থাকবেন।
জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কমিটির সভাপতি থাকবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সভাপতির মনোনীত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। একই জেলার মধ্যে শিক্ষক বদলির আবেদন এ কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। নতুন নিয়োগ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদের লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পদায়নের দায়িত্বও জেলা কমিটির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
উপজেলা বা থানা পর্যায়ে ইউএনও কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সভাপতির মনোনীত দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সদস্য সচিব হিসেবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। একই উপজেলা বা থানার মধ্যে বদলির আবেদন এ কমিটি নিষ্পত্তি করবে।
আবেদন নিষ্পত্তি হবে মাসিক সভায়
প্রজ্ঞাপনে বদলির আবেদন গ্রহণের পদ্ধতি বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, প্রতিটি কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করে আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে সভার কার্যবিবরণী ও প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে।
যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আগে ‘প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে’ বদলির আদেশ পেয়েছিলেন, সেসব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অফলাইনে ফেরা
২০২৩ সালের আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি পুরোপুরি অফলাইন পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো। বিধিমালায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বদলির কথা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির ও ঘুষের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। অনেক শিক্ষক অভিযোগ করতেন, প্রকৃত জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকরা বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অনলাইন বদলি ব্যবস্থা চালু করে। এতে কর্মস্থল ও কাঙ্ক্ষিত বিদ্যালয়ের দূরত্ব, চাকরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকায় কর্মকাল, নারী শিক্ষক, প্রতিবন্ধিতা, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, বিবাহবিচ্ছেদ, স্বামীর মৃত্যু এবং অন্যান্য মানবিক বিষয় বিবেচনায় নির্ধারিত স্কোরের ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়ন করা হতো। সর্বোচ্চ স্কোরধারী শিক্ষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলির জন্য নির্বাচিত হতেন।
যদিও স্কোরিং পদ্ধতির কিছু বিষয়ে শিক্ষকদের একটি অংশের আপত্তি ছিল, তবুও অধিকাংশ শিক্ষক প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন।
‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন
নতুন প্রজ্ঞাপনে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’কে সদস্য রাখার বিধান করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তার কোনো সংজ্ঞা বা যোগ্যতার মানদণ্ড উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, সরকারি বদলি প্রক্রিয়ায় বহিরাগত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়াতে পারে। এতে অতীতের মতো ঘুষ, তদবির ও অনিয়মের ঝুঁকি রয়েছে।
স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ
প্রাথমিক শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, শিক্ষা প্রশাসনের একাংশ এবং শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারি সেবায় যখন ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, তখন শিক্ষক বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম আবারও কমিটির বিবেচনার ওপর নির্ভর করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নয়।
তাদের মতে, বদলির ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত যত বাড়বে, রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির ও দুর্নীতির সুযোগও তত বৃদ্ধি পাবে। বরং প্রযুক্তিনির্ভর সফটওয়্যারের মাধ্যমে শূন্যপদ, চাকরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন, পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনসহ বিভিন্ন সূচক স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করে বদলি সম্পন্ন করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দিন মাসুদ সমকালকে বলেন, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষকরা অনলাইন বদলিকেই যথোপযুক্ত বলে মনে করি। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্কোরের ভিত্তিতে স্বচ্ছতার সঙ্গে একজন শিক্ষক বদলি হতে পারেন।’
সাধারণ বদলি দীর্ঘদিন বন্ধ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের সাধারণ বদলি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন বদলি চালুর নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত বদলি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেয় এবং অনলাইন বদলি নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি কার্যকর না করে কমিটিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষক বদলির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। সেই নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কমিটিভিত্তিক ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কার্যকর থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন বদলি কার্যক্রম স্থবির থাকায় দ্রুত তা সচল করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন শেষে আরও আধুনিক, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে বদলি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে এক কোটি ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ জন শিক্ষার্থী এবং কর্মরত আছেন তিন লাখ ৫৯ হাজার ৯৫ জন শিক্ষক।
- বিষয় :
- শিক্ষক
