৩৮ বছরের ‘ইত্যাদি’ কতটা মন ভরাতে পারল
ছবি: সংগৃহীত
মুহাম্মদ আবু সাঈদ
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১৫:০০
প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর এক ঈদ-ইত্যাদি উপহার দিলেন কিংবদন্তি হানিফ সংকেত। নাট্যাংশ, নৃত্য, মিউজিক্যাল ড্রামা, গান–সবকিছুর নান্দনিক মিশেল এবং বিনোদন আর শিক্ষাবার্তায় ভরপুর ছিল এবারের ইত্যাদি। দর্শকের হৃদয়কাড়া এ অনুষ্ঠানটি এবারে পা দিয়েছে গৌরবের ৩৮ বছরে। আশির দশকের শেষ দিকে যার পথচলা শুরু, বিরামহীনভাবে দোর্দণ্ড প্রতাপে এখনও তা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
বরাবরের মতো এবারের ঈদ-ইত্যাদির শুরুতেই ছিল চিরায়ত সেই হৃদয়স্পর্শী গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। গানের চিত্রায়ণে এবারও ছিল ব্যতিক্রমী মুনশিয়ানা। বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের একাকিত্বে ভোগা কিছু মানুষের মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চিরচেনা এই গানটি। ইত্যাদির শুরুর এমন চমকের পর একে একে উঠে এসেছে আরও নানা আয়োজন। অবৈধ আয়ের কারণে ‘বিশাল’ উচ্চবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত–এই তিন শ্রেণির মানুষের ঈদ বাজারের মিউজিক্যাল ড্রামাটি বেশ প্রশংসার দাবিদার। উচ্চবিত্তের অতিদামি পোশাক কেনা, নিম্ন-মধ্যবিত্তের কোনো রকমের কেনাকাটা এবং নিম্নবিত্তের কেনাকাটাহীন ঈদের চিত্র আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
শহীদুজ্জামান সেলিম ও রোজী সিদ্দিকীর আরেকটি মিউজিক্যাল ড্রামায় এক চিরসত্য দার্শনিক তত্ত্বের প্রসঙ্গ এসেছে–‘বিশ্বাসে মিলায় কিন্তু বিশ্বাসই তো নাই’। দুজন ব্যবসায়ীর দোকানে কেনাকাটা এবং পরে সন্তানদের ঈদে বাড়ি আসার ক্ষেত্রে বিশ্বাসের প্রসঙ্গ এলেই এমন উক্তির অবতারণা ঘটে। আমাদের সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার অতিবাস্তব এক সত্য এই উক্তিতে উঠে এসেছে। সমাজের আরও নানান অসংগতি নিয়ে এবারের দর্শকপর্বটি ছিল বেশ প্রাণবন্ত। প্রতীকী ‘তালা’ নিয়ে আয়োজিত এ দর্শকপর্বটিতে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন মোশাররফ করিম। তাঁর ভাষ্যে গুজব, অযথা সমালোচনা, অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম, দুর্নীতি– প্রতিটি ক্ষেত্রে কী করণীয়, সেটিও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এতসব খারাপ খবর ও খারাপ মানুষের ভিড়েও কিছু মানুষ থাকেন ভালো, সৎ ও সচ্চরিত্রের অধিকারী। এমন কিছু ভালো মানুষকে পুরস্কৃত করার ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখা গেল একটি নাট্যাংশে। সেখানকার অনুষ্ঠানের নাম ‘পরিষ্কার পুরস্কার’। ভালো বাড়িওয়ালা–যিনি ভাড়াটিয়াকে নিজের আত্মীয় মনে করেন, ভালো গাড়িচালক–যিনি সবসময় সাবধানে গাড়ি চালান, ভালো গৃহকর্ত্রী–যিনি গৃহকর্মীকে নিজের পরিবারের সদস্য মনে করেন, ভালো যুবক–যিনি মুরব্বিদের সম্মান করেন, এমন বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে যোগ্য ব্যক্তিদের পুরস্কার দেওয়া হয়। এই নাট্যাংশটির মাধ্যমে সমাজের উজ্জ্বল দিক তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার দিকও উঠে এসেছে। সেই অন্ধকার দূর করেই যে আলো আনতে হবে–এমন একটি নান্দনিক আহ্বান আমরা দেখতে পাই এই নাট্যাংশে। আবার, ছোটবেলায় পড়া নানান নীতিকথা যে পরবর্তী জীবনে অনেকেই মেনে চলছেন না–এমনটাই তুলে ধরা হয়েছে গানে গানে। সাবিলা নূর ও শরিফুল রাজের সঙ্গে এতে অংশ নেন ইত্যাদির নিয়মিত নৃত্যশিল্পীরা। নৃত্য ও গীতের মাধ্যমে এতে সমাজের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে, যা ছিল বেশ উপভোগ্য ও উৎসাহ-জাগানিয়া। বিদেশিদের নিয়ে পর্বটিও আমাদের সমাজের এক শ্রেণির খারাপ লোকদের নির্দেশ করে; যারা দু-মুখো সাপ ও নিজের স্বার্থে যে কোনো সময় দলবদল করতে পারে।
এভাবেই সমাজের ছোট-বড় অসংগতি নিয়ে ভরপুর ছিল এবারের ঈদ-ইত্যাদি। পাশাপাশি মানহীন ভিডিও কনটেন্ট ও তা বেশি-বেশি ভিউ হওয়ার বিষয়ে ছিল একাধিক নাট্যাংশ, যা একদিকে যেমন তীব্র বিদ্রুপাত্মক, অন্যদিকে বেশ উপভোগ্য। বিশেষ করে ‘ভাইরাল স্পেশালাইজড হাসপাতাল’-সংক্রান্ত নাট্যাংশটি ছিল বেশ যুগোপযোগী। সম্প্রতি আমরা দেখতে পেয়েছি, ভাইরাল হওয়ার চিন্তায় অনেকে নানান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এমনই প্রেক্ষাপটে ‘ভাইরাল স্পেশালাইজড হাসপাতাল’! জ্যোতিষীরাও এখন ভাইরাল-সংক্রান্ত পাথর দিচ্ছেন, যেমন–ভিউ পাথর, সাবস্ক্রাইব পাথর, ইনস্টাগ্রাম পাথর ইত্যাদি। এসব নিয়ে করা নাট্যাংশটিও ছিল সময়োপযোগী। এতসব নাট্যাংশ ও নৃত্যগীতের পাশাপাশি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজনে ছিলেন ইমরান ও বুবলী। ইমরান গানের জগতের মানুষ হলেও বুবলী অভিনয় জগতের। দুজনের দুর্দান্ত পরিবেশনায় মিষ্টিমধুর গানটি দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তমা মির্জা ও হিমির মোহনীয় নৃত্য, হাবিব ওয়াহিদের ঝলমলে গান, নাতিকে নিয়ে পর্ব, সাবিনা ইয়াসমিন ও অন্য সহশিল্পীদের দেশাত্মবোধক গান–সবই ছিল বেশ উপভোগ্য। সব মিলিয়ে এবারের ইত্যাদি ছিল অনন্য, অসাধারণ; যা ইত্যাদির চিরচেনা বৈশিষ্ট্য। এমন অনন্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সবার প্রাণপ্রিয় হানিফ সংকেত এবার ভূষিত হয়েছেন সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদকে। যোগ্য ব্যক্তির হাতে যোগ্য পুরস্কার। এবারের ইত্যাদির নাট্যাংশের মতোই বলা যায় ‘পরিষ্কার পুরস্কার’।
- বিষয় :
- হানিফ সংকেত
- ইত্যাদি
