ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

দ্য ওডিসি: পৌরাণিক গল্পের আইম্যাক্স সংস্করণ, কী আছে কী নেই

দ্য ওডিসি: পৌরাণিক গল্পের আইম্যাক্স সংস্করণ, কী আছে কী নেই
×

দ্য ওডিসি-তে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন ও জেনডায়া। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৩৭ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৮:২২

তারকায় ঠাসা ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’ এরই মধ্যে বক্স অফিসে হিট করেছে। দর্শকের মন জয়ের পাশাপাশি আলোচনার ঝড় তুলেছে গোটা দুনিয়ায়। এটি দেখতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সিনেমাপ্রেমীরা বিশেষ ফরম্যাটের থিয়েটারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। আক্ষেপ নিয়ে অনেকে আবার মিম বানিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম।

হাজার বছরের পুরোনো গল্পের নতুন এই সংস্করণ নিজেই যেন একটা মহাকাব্য হয়ে উঠেছে। নোলান দ্য ওডিসির পুরোটাই আইম্যাক্স ফিল্ম ক্যামেরায় শুট করেছেন। ফিচার ফিল্মের ইতিহাসে যা প্রথম ঘটনা। আর এটাই সিনেমার মার্কেটিং ক্যাম্পেইনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। ফলাফলও মিলেছে হাতেনাতে।

সিনেমায় ব্যবহৃত বিশেষ ৭০এমএম সেলুলয়েড ফিল্মের রেজোলিউশনকে বলা হচ্ছে, ‘আলট্রা হাই’। ফ্রেমটাও অস্বাভাবিক চওড়া। নোলান বলেছেন, ‘সেরা অভিজ্ঞতা পেতে হলে ডিজিটালের বদলে আসল ফিল্মের প্রজেকশন দেখতে হবে।’ অর্থাৎ, যেসব হলে অরিজিনাল ফিল্ম রিল ব্যবহার করা হয় সেখানে সিনেমাটি দেখতে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন।

কিন্তু মুশকিল হলো, বিশ্বে মাত্র কয়েকটি থিয়েটারে আইম্যাক্স ৭০এমএম ফিল্ম চালানোর ব্যবস্থা আছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। 

আইম্যাক্স কী?
ক্রিস্টোফার নোলানের কাজগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, তিনি আইম্যাক্সের অন্যতম বড় সমর্থক। প্রায়ই আইম্যাক্স ক্যামেরা দিয়ে সিনেমা শুট ও আইম্যাক্স থিয়েটারে সেটি প্রদর্শন করেন। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানার আগে আইম্যাক্স সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া যাক।

দ্য ওডিসির পুরোটাই আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করেছেন ক্রিস্টোফার নোলান। ছবি: আইম্যাক্সের সৌজন্যে

আইম্যাক্স হলো এমন একটি কোম্পানি যাদের নিজস্ব হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা, ফিল্ম ফরম্যাট, প্রজেক্টর এবং থিয়েটার আছে। এই থিয়েটারের সঙ্গে সাধারণ সিনেমা হলের মূল পার্থক্য পর্দা ও অডিটোরিয়ামের আকারে। নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আইম্যাক্স কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিশেষ এই থিয়েটারে মেঝে থেকে ছাদ ও দেয়ালজুড়ে পর্দা বাঁকানো থাকে। 

আইম্যাক্স পর্দার পেছনে স্পিকার ব্যবহার করে। হলের আসন বিন্যাস হয় অনেকটা স্টেডিয়ামের মতো। ফলে দর্শক যেখানেই বসুক না কেন, মনে হবে পর্দার একদম সামনাসামনি বসে আছেন। আলট্রা হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণের কারণে পর্দায় সবকিছু স্বচ্ছ ও নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, আইম্যাক্স এসব বৈশিষ্ট্যকে একত্রিত করে বিশ্বের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা দিয়ে আসছে।

আইম্যাক্স ৭০এমএম ফিল্ম স্ট্রিপগুলো সাধারণ ৭০এমএম ফিল্মের চেয়ে বড় হয়।

স্টুডিওবাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালে কানাডিয়ান পরিচালক গ্রেইম ফার্গুসন, রোমান ক্রোইটর, রবার্ট কের এবং প্রকৌশলী উইলিয়াম শ নতুন ধাঁচে বড় ফরম্যাটের সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেন। শুরুতে তারা একটি করে ক্যামেরা ও প্রজেক্টর দিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের সিনেমা বানান। আইম্যাক্স কোম্পানির ব্যানারে তাদের নির্মিত প্রথম সিনেমাটির নাম ‘টাইগার চাইল্ড’। ১৯৭০ সালে সেটি জাপানের ওসাকায় প্রথম প্রদর্শন করা হয়। 

এই প্রযুক্তি মূলধারায় আসে ক্রিস্টোফার নোলানের মাধ্যমে। তাঁর বিখ্যাত দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস, ইন্টারস্টেলার ও ডানকার্কের মতো বড় বাজেটের সিনেমা আইম্যাক্সের খ্যাতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।  

নোলান কেন আইম্যাক্সে সিনেমা বানান?
ব্রিটিশ-আমেরিকান এই পরিচালকের সিনেমা দেখার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো, দৃশ্যের বুনন ও নির্মাণশৈলী অত্যন্ত ভারী। যা দেখার পর মাথা ক্লান্ত হয়ে যায়। আর দেখার সময় পরস্পরবিরোধী দুটি অনুভূতি কাজ করে। একবার মনে হয়, ‘এই বুঝি কাহিনী ধরে ফেললাম’। পরক্ষণেই মনে হয়, ‘কাহিনী কোথায় থেকে কোথায় গড়াল!’

বছরের পর বছর ধরে নোলান গল্প বলার যে ধাঁচ তৈরি করেছেন, সেটা দেখতে অনেকটা বৃত্তের মতো। যেমন, নোলান তাঁর সিনেমার শুরু আর শেষ একইরকমভাবে করতে পছন্দ করেন। প্রায়ই মন্টাজ সিকোয়েন্স দিয়ে গল্পের মঞ্চ সাজান আবার সবকিছু গুটিয়েও দেন।

দ্য ওডিসির শুটিংয়ের সময় ক্যামেরার পেছনে ক্রিস্টোফার নোলান। ছবি: ইউনিভার্সাল পিকচার্স

ধারণা করা হয়, নোলান তাঁর গল্প বলার পদ্ধতিকে অনন্য করে তুলতে চান দৃশ্য আর শব্দ দিয়ে। যে কাজ আইম্যাক্সের প্রযুক্তি অনেকটা নিখুঁতভাবে করতে পারে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দ্য ওডিসির গল্পটাই এমন যে, দৃশ্য ও সংলাপ ধারণের জন্য আইম্যাক্সের এখনও বিকল্প তৈরি হয়নি।

ওডিসির গল্প, কী আছে কী নেই
প্রথমত, সিনেমাটির প্রচারের সময় আইম্যাক্স ও উন্নত প্রযুক্তির কথা অনেক বেশি নজর কেড়েছে। দ্বিতীয়ত, নোলানের সিনেমা নিয়ে সবসময়ই দর্শকদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা থাকে। 

তবে দিন শেষে গল্প আর নির্মাণশৈলীই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। সেটি কেমন হয়েছে?
 
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দীতে গ্রিক ভাষায় লেখা হোমারের কবিতার ওপর ভিত্তি করে সিনেমাটি তৈরি। যেখানে নায়ক ওডিসিয়াসকে দেখানো হয়েছে- ট্রোজান যুদ্ধের পর বাড়ি ফেরার পথে তিনি একের পর এক বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন। ট্রোজান যুদ্ধটি ট্রয় নগরী ধ্বংসের কাহিনীর জন্য বেশি পরিচিত।

সিনেমায় ওডিসিয়াসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। আর তাঁর স্ত্রী পেনেলোপির চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যান হ্যাথাওয়ে। তাদের ছেলে টেলেমেকাসের চরিত্রে আছেন টম হল্যান্ড।

কবিতাকে যেসব বিষয় মহান করেছে, সেগুলোর অনেক কিছুই সিনেমায় নেই। ছবি: সংগৃহীত

অস্কারজয়ী ওপেনহেইমারের (২০২৩) পর এটা নোলানের প্রথম সিনেমা। যা অনেককে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু মানবজাতির সবচেয়ে পুরোনো গল্পটির আধুনিক রূপান্তর সবার মন জয় করতে পারেনি। যেমন, হোমারের লেখা ওডিসির অনুবাদক এমিলি উইলসন লন্ডন রিভিউ অব বুকসে নোলানের চিত্রনাট্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, সিনেমাটিতে মনস্তাত্ত্বিক, আবেগ, রাজনৈতিক ও নৈতিক গভীরতা নেই।

উইলসন আরও লিখেছেন, ‘সিনেমাটিতে যে গল্প দেখানো হয়েছে, তার কোনো অংশ যদি আমি লিখতাম, তবে নিজেই লজ্জা পেতাম।’ তাঁর মতে, হোমারের কবিতাকে যেসব বিষয় মহান করে তুলেছে, সেগুলোর অনেক কিছুই সিনেমায় নেই।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টাইমসে ঐতিহাসিক মেরি বিয়ার্ড আক্ষেপ করে লিখেছেন, হোমারের কবিতা থেকে কামনার ধাঁধা, কৌশলী বিদ্রূপ, সত্য-মিথ্যা নিয়ে কৌতূহল জাগানো প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে সিনেমায় সভ্যতার পতন সংক্রান্ত গুরুগম্ভীর হলিউডি বার্তা ঢুকানো হয়েছে।

মিমের বন্যা, মাস্কের রাগ
সিনেমায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও পরিচালক নোলান নিজে সবসময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। ফলে অনলাইনের দুনিয়ায় তাঁর সিনেমা নিয়ে কী চলছে, সেটার অনেক কিছুই হয়তো তিনি মিস করেন।  

সিনেমাটি মুক্তির পর সামাজিক মাধ্যমে বেশ কিছু ক্লিপ দিয়ে মিম বানাতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ম্যাট ডেমনকে ঘিরে। সেভিং পাইভেট রায়ান, দ্য মার্শিয়ান ও ইন্টারস্টেলারের পর ডেমন এবারও এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। এই মিলকে মিম বানাতে ছাড়েননি নেটিজেনরা।

এক্সে ইলন মাস্কও মজার ছলে নোলানকে রীতিমত সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, চলতি বছরই এই সিনেমার নতুন ও আরও ভালো সংস্করণ বানাবেন। এর জন্য ব্যবহার করবেন নিজের মালিকানাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কোম্পানি এক্সএআইয়ের গ্রোক ইমেজ জেনারেটর।

আরও পড়ুন

×