পাড়ার মঞ্চ থেকে রূপালি পর্দার অভিনেতা
ইমতিয়াজ বর্ষণ। ছবি: সংগৃহীত
এমদাদুল হক মিল্টন
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:০৮ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:১৩
পাড়ার মঞ্চে অভিনয়ের হাতেখড়ি। এরপর থিয়েটার, ছোট পর্দা, ওয়েব ও সিনেমা– প্রতিটি মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। ভিন্নধর্মী চরিত্রে সাবলীল অভিনয়ের জন্য ইতোমধ্যেই দর্শকের কাছে আলাদা একটি জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। এবার সেই যাত্রায় যুক্ত হলো ফুয়াদুজ্জামান ফুয়াদ পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’।
চরকিতে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রের গল্প একদিকে ব্যক্তিগত বেদনার, অন্যদিকে ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে গভীর শঙ্কার। করোনাকালে বাবাকে হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে প্রযোজক মাহফুজ নাজিমের মনে জন্ম নেওয়া ভাবনা শেষ পর্যন্ত পর্দায় রূপ পেয়েছে। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন– নিঃশ্বাস।

তূর্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, সেই মাস্কের নল গিয়ে যুক্ত হয়েছে কাচের পাত্রে বন্দি একটি ছোট গাছের সঙ্গে– চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তিশালী দৃশ্য এটি। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে এমন প্রতীকী উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে একটি গাছের অস্তিত্ব যেন একজন মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
চলচ্চিত্রটিতে কাজের অভিজ্ঞতা ও তূর্য চরিত্রটি নিয়ে বর্ষণ বলেন, ‘একটুখানি শ্বাস নেওয়ার আশায় যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের দৃশ্যকাব্য হলো ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’। এটি শুধু পরিবেশ বিপর্যয়ের গল্প নয়; বরং অদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ভয়ংকর আশঙ্কার ছবি। যে কারণে কাজটি চ্যালেঞ্জিং ছিল। নির্মাতা যেভাবে চেয়েছেন আমরা সেভাবেই কাজটি করেছি। তূর্য চরিত্রে সংলাপের চেয়ে শরীরী ভাষা, চোখের অভিব্যক্তি এবং নীরবতার ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে সংলাপের প্রাচুর্য নেই; বরং নিঃশ্বাসের শব্দই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। এটি ক্রিটিক্যাল স্টোরি। যারা সাধারণত লাইট স্টোরি দেখতে দেখতে অভ্যস্থ, তাদের জন্য একটি ডিফরেন্ট টেস্ট হবে ছবিটি। অভিনয়ের ক্ষেত্রে আমার জন্য ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।’
বর্ষণ আরও বলেন, ‘পরিচালকের নির্মাণ ভাবনাতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। লম্বা স্থির ফ্রেম, বিমূর্ত দৃশ্যপট এবং শব্দনির্ভর আবহের মধ্য দিয়ে তিনি এমন একটি পৃথিবী তৈরি করেছেন, যা কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। ঢাকার বায়ুদূষণ, সবুজ ধ্বংস এবং জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে গল্পটি দর্শককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দর্শক কাজটি গ্রহণ করেছেন বলেই পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।’
ইমতিয়াজ বর্ষণের অভিনয়যাত্রা শুরু হয়েছিল কৈশোরে পাড়ার একুশে ফেব্রুয়ারির নাটকের মহড়া থেকে। পরে চট্টগ্রামের তির্যক নাট্যগোষ্ঠীতে কাজ করেন। যুক্ত হন থিয়েটার অ্যাভাঁগার্ড ও মূকাভিনয়ের দল নাটুয়া নির্বাক সম্প্রদায়ের সঙ্গে। অভিনয়ের পাশাপাশি থিয়েটার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের চেষ্টাও করেছেন।

২০১০ সালে ঢাকায় এসে পরিচালক নুরুল আলম আতিকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ছোট পর্দায় তাঁর অভিনয়ের শুরুটিও আতিকের নির্মাণে। এরপর ধীরে ধীরে ওয়েব ও চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করেন।
মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক তাঁর। এরপর ‘চন্দ্রাবতীর কথা’ ও ‘ওরা ৭ জন’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘অমীমাংসিত’, ‘কাইজার’, ‘কালপুরুষ’, ‘গোলাম মামুন’, ‘সাড়ে ১৬’, ‘আকা’সহ বিভিন্ন ওয়েব কনটেন্টে তাঁর চরিত্রের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো। অভিনয় নিয়ে তাঁর দর্শনও স্পষ্ট। ‘অভিনেতার অনেক দিন বেঁচে থাকার জন্য একটি ভালো সিনেমাই যথেষ্ট,’–এমন বিশ্বাস থেকেই গল্প ও চরিত্রকে কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
শুধু অভিনয়েই থেমে নেই বর্ষণের সৃজনশীলতা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান না শিখেও গায়ক ও সুরকার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’-এর ‘প্রথম ঝরে পড়া শিউলিটা’ গানটির সুর তাঁরই করা। তাসনিম আনিকার সঙ্গে গেয়েছেন ‘মিথ্যে বলিনি’। নিজের লেখা ও সুর করা ‘মেঘে মেঘে’ প্রকাশ করেছে তাঁর গানের দল ‘হ্যালির ধূমকেতু’। গান তাঁর কাছে পেশার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসার জায়গা। অভিনয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও তাই সংগীতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তবে এই মুহূর্তে নতুন গান প্রকাশের চিন্তাভাবনা নেই বলে জানান তিনি। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর অভিনীত ‘১৯৭১: করতলে ছিন্নমাথা’, ‘যাপিত জীবন’, ‘রবি ইন ঢাকা’, সন্দেশসহ কয়েকটি সিনেমা। ভিন্ন জন্যরার সিনেমাগুলো নিয়ে বেশ আশাবাদী এই অভিনেতা।
বর্তমানে তিনি কক্সবাজারে ‘জলের রঙ লাল’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। এটি পরিচালনা করেছেন নীভ রহমান। কাজ নিয়ে বছরজুড়ে ব্যস্ত থাকলেও সুযোগ পেলে বই পড়েন, সিনেমা দেখেন। ঘুরে বেড়াতে যান দূরে কোথাও। মঞ্চে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও আপাতত সিনেমা ও ওটিটিতেই তাঁর ব্যস্ততা বেশি। তবে লক্ষ্য একটাই– অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে ক্রমাগত ভাঙা ও গড়া। পাড়ার ছোট মঞ্চ থেকে বড় পর্দা– ইমতিয়াজ বর্ষণের পথচলা তাই কেবল একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; এটি নিজেকে খুঁজে নেওয়া এক শিল্পীর নিরন্তর যাত্রা।
- বিষয় :
- ইমতিয়াজ বর্ষণ
- অভিনেতা