নায়করাজ একজনই
নায়করাজ রাজ্জাক। ছবি: সংগৃহীত
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩২
রাজা নেই, সিংহাসন আছে। রাজ্যও আছে, নেই সেই রাজকীয় উপস্থিতি। দেখতে দেখতে নায়করাজ রাজ্জাকহীন ৯টি বছর পার হয়ে গেল। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা যেন সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। পর্দায় তাঁর হাসি, সংলাপ, অভিব্যক্তি কিংবা কোনো গানের দৃশ্য–সবকিছুতেই আজও ফিরে আসে এক স্বর্ণালি সময়ের স্মৃতি। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই ‘রাজা’ নেই, কিন্তু তাঁর রাজত্ব এখনও শেষ হয়নি। আজ (২১ আগস্ট) নায়করাজ রাজ্জাকের নবম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের এই দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কিংবদন্তি এ অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ককে হারায়নি দেশের চলচ্চিত্র; হারিয়েছে এমন একজন অভিভাবককে, যিনি প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে অভিনয়, নির্মাণ ও প্রযোজনার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।
পরিবারের বাইরে নেই তেমন আয়োজন
নায়করাজের নবম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রের সংগঠনগুলো নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়নি। এফডিসিতেও নেই কোনো আয়োজন। এফডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রি বড়ুয়া জানিয়েছেন, ‘নায়ক রাজ্জাকের মৃত্যুবার্ষিকী যেহেতু সরকারিভাবে পালন করা হয় না তাই এফডিসির উদোগে কোনো আয়োজন থাকছে না। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি নায়করাজের সমাধিতে ফুল দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি টিভি চ্যানেলে নায়করাজকে স্মরণ করে তাঁর অভিনীত কিছু সিনেমা প্রচার ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বলে জানানো হয়েছে। নায়করাজের নবম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণ পারিবারিক আয়োজন নিয়ে রাজ্জাকপুত্র বাপ্পারাজ বলেন, ‘বাবা তো আমাদের কাছে প্রতিদিনই স্মরণীয়। তবে এই দিনটায় আমরা বাবার কবরে যাই, মিলাদ মাহফিল করি। দেশবাসীর কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।’ নায়করাজ রাজ্জাকের ছোটছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট বলেন, ‘আব্বা ছাড়া দেখতে দেখতে ৯টি বছর চলে গেল। যেহেতু নায়করাজ আমার বাবা, স্বাভাবিকভাবেই পারিবারিকভাবে আব্বাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কিন্তু এর বাইরে চলচ্চিত্র পরিবার বা ইন্ডাস্ট্রি আব্বাকে মনে করল কী করল না, সেটা নিয়ে আগে মন খারাপ হতো। এখন আর এসব নিয়ে ভাবি না। আমরা শুধু আব্বার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। আমি বিশ্বাস করি, আব্বা বেঁচে থাকবেন যুগের পর যুগ তাঁর ভক্ত-দর্শকের হৃদয়ে।’
দর্শকদের কাছে চির অম্লান
চিরবিদায়ের ৯ বছর পরও তাঁর সিনেমা দেখলে দর্শক ফিরে যান নিজেদের কৈশোর-তারুণ্যের দিনে। তাঁর ঠোঁটে উচ্চারিত সংলাপ কিংবা গানে ভেসে আসা কণ্ঠ আজও তৈরি করে নস্টালজিয়া। ‘আমি এক দুরন্ত যাযাবর’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’, ‘আয়নায় ওই মুখ দেখবে যখন’, ‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’–এসব গান ও দৃশ্য যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সিনেমায় গল্প বলার ভাষা, দর্শকের রুচি ও বিনোদনের মাধ্যম বদলালেও নায়করাজ রাজ্জাক রাজার আসনেই বিদ্যমান। কারণ তিনি শুধু নায়ক ছিলেন না, ছিলেন সময়ের প্রতীক, একটি প্রজন্মের আবেগ। তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলোতে আজও দর্শক খুঁজে পান নিজেদের গল্প, নিজেদের ভালোবাসা, নিজেদের স্বপ্ন। তাই চলে যাওয়ার ৯ বছরেও দর্শকের হৃদয়ে তাঁর সিংহাসনটি এখনও অটুট।
নায়ক থেকে নায়করাজ
নায়করাজ রাজ্জাকের ঢালিউডের পাশাপাশি কলকাতা ও উর্দু চলচ্চিত্রেও ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়তা। প্রায় অর্ধশত বছরের ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় তিনি কাটিয়েছেন চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্ম রাজ্জাকের। অভিনয়ে তাঁর শুরুর দিনগুলোতে ‘আখেরি স্টেশন’, ‘কার বউ’, ‘কাগজের নৌকা’সহ কয়েকটি সিনেমায় কাজ করেন রাজ্জাক। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’য়। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সুচন্দা। এ সিনেমার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘স্মরলিপি’, ‘মনের মতো বউ’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘অবুঝ মন’সহ একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় তারকা।
সত্তর ও আশির দশকে রাজ্জাক ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তারকা। কবরী, শাবানা, ববিতাসহ তৎকালীন জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের কাছে হয়ে ওঠে ভালোবাসার প্রতীক। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চোখের জলে’সহ অসংখ্য সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী আসন করে নেয়। শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে নয়, সামাজিক ও জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্রেও তিনি নিজেকে বারবার ভেঙেছেন। নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও অভিনয়ের বৈচিত্র্য ধরে রেখেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে কখনও প্রেম, কখনও প্রতিবাদ, কখনও মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, কখনও সাধারণ মানুষের আবেগ হয়ে উঠেছে পর্দার গল্প। তাঁর অভিনীত সিনেমার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে সংখ্যার হিসাব ছাড়িয়ে তাঁর প্রভাবের ব্যাপ্তিই তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে।
- বিষয় :
- নায়করাজ
- মৃত্যুবার্ষিকী