ইউক্রেন যুদ্ধে সেনাদের বদলে লড়ছে রোবট, রাশিয়ার ওপর কি চাপ বাড়ছে?
জানুয়ারি থেকে এই চালকবিহীন মেশিনগুলো ২২ হাজার মিশন পরিচালনা করেছে। ছবি: সংগৃহীত
সিএনএন
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ১৫:৩৯ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১০:০৪
শোঁ শোঁ শব্দের পর মুহূর্তেই আকাশে ছড়িয়ে পড়ে ধুলার মেঘ। কয়েক সেকেন্ডের অস্পষ্টতা কাটতেই ভেসে ওঠে ভয়াবহ বিস্ফোরণের দৃশ্য। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে এমন দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়-বরং এটি ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
মাটির নিচে কয়েক মাইল দূরে বসে অবদিভকা ও বাখমুতের মতো শহরে যুদ্ধের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেনারা এখন নতুন এক ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। এই যুদ্ধে শত্রুকে হত্যা করার অনুভূতি তারা সরাসরি অনুভব করতে পারেন না, ঘ্রাণ পান না বা কাছ থেকে দেখতেও পারেন না।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার সামনের সারির তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে ছয়টি বিস্ফোরণ ঘটাবে এই মিশন। তবে মাঠে কোনো ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য থাকবেন না। এর বদলে গেমারের মতো চেয়ারে বসে পুরো লড়াই নিয়ন্ত্রণ করবেন তারা। ওপর থেকে নজরদারি ড্রোনের মাধ্যমে সব পর্যবেক্ষণ করা হবে, আর পুরো অভিযান পরিচালিত হবে বিশেষায়িত লাইভস্ট্রিম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
কয়েক মাস ধরে জনবল সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকা ইউক্রেন এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের যুদ্ধের একটি বড় অংশ এখন চালকবিহীন। রোবট, ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকগুলো একঘেয়ে ও ক্লান্ত রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন সুবিধা এনে দিয়েছে।
গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, সম্পূর্ণ রোবট ও ড্রোনের মাধ্যমে তারা প্রথমবারের মতো একটি রুশ ঘাঁটি দখল করেছেন। জানুয়ারি থেকে এই চালকবিহীন মেশিনগুলো ২২ হাজার মিশন পরিচালনা করেছে।

কম্পিউটার প্রসেসরের ফ্যানের কমলা আলো এবং মাথার ওপর হালকা আলোর নিচে টিকে থাকার লড়াই থেকেই এই নতুন প্রযুক্তির জন্ম। এখানকার ইউনিট রুশ যুদ্ধবন্দীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে, চার চাকার চ্যাসিসে বিপুল বিস্ফোরক বহনকারী এসব রোবটকে শত্রুরা ‘নীরব মৃত্যু’ বলে ডাকে। এগুলো যখন মাত্র ১০ মিটার দূরে থাকে, তখনই শত্রুরা এদের শব্দ শুনতে পায়। ততক্ষণে এটি শত্রু অবস্থানের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
হিসাবটা খুবই সরল। থার্ড অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ‘এনসি১৩’ ইউনিটের মতে, ১৬৪টি রোবট মিশনে যে কাজ হয়েছে, তা করতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ সেনার প্রয়োজন হতো। এতে তাদের ইউনিটের অর্ধেক সেনা নিহত বা আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকত। অর্থাৎ এই চালকবিহীন রোবটগুলো হাজারো ইউক্রেনীয়র জীবন বাঁচিয়েছে।
নৃশংস যুদ্ধের দিনগুলো স্মরণ করে ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার ‘বার’ বলেন, ‘তখনকার দিনে আমি এটা কল্পনাও করতে পারতাম না। এখন বুঝতে পারছি, ওই সময় এই সরঞ্জাম থাকলে আমার আরও অনেক সহযোদ্ধা বেঁচে যেতেন।’
রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় গ্রেনেড লঞ্চার যুক্ত একটি ড্রোনের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন চালাচ্ছেন ইউক্রেনের সেনারা।
তবে ইউনিট কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচের কাছে এই নতুন বাস্তবতা কিছুটা অপূর্ণ মনে হয়। তিনি বলেন, ‘তখনকার দিনে যুদ্ধটা ছিল আরও পুরুষোচিত। সেখানে দক্ষতাই ছিল মূল বিষয়—কত ভালো প্রশিক্ষণ, কতটা শৃঙ্খলা। এখন সবকিছুই নির্ধারণ করে প্রযুক্তি। আর পেছনে ফেরার পথ নেই।’
তিনি আরও বলেন, এই চালকবিহীন যুদ্ধ এখন এক ধরনের প্রতিযোগিতা-কে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে এবং উন্নত হতে পারে।
যুদ্ধের নতুন যুগ
ইউক্রেনের এই পদ্ধতি মূলত জনবল সংকট থেকেই তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার চার বছরের হামলায় দেশটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কিয়েভ শুরু থেকেই ড্রোনকে যেভাবে গ্রহণ করেছে এবং এর নির্ভুলতা ও শক্তিকে যেভাবে শিল্পায়িত করেছে, তা মস্কোর ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
ইউক্রেনের বর্তমান লক্ষ্য হলো প্রতি মাসে ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা বা আহত করা, যা তারা এই বছর অর্জন করেছে। এর উদ্দেশ্য ক্রেমলিনকে বাধ্য করা, যাতে তারা বড় শহর ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে অস্বস্তিকরভাবে সৈন্য নিয়োগ করে।

নতুন তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ বলছে, রাশিয়ায় নিহত সেনার সংখ্যা ইতোমধ্যে পাঁচ লাখে পৌঁছেছে।
এই নতুন যুদ্ধের নতুন নায়কও আছে। তাদের একজন হলেন ২২ বছর বয়সী গোরা, যিনি নিজেকে প্রথমে ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ বললেও পরে সংশোধন করে বলেন, তিনি আসলে ‘এমবেডেড হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী’।
লাইভস্ট্রিম কন্ট্রোল সেন্টারে রোবট তৈরি ও মেরামতের বডি শপের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমি একজন এমবেডেড হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী।’
যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলায় রাতে ঘুমাতে না পারা তাঁকে নতুন ফ্রন্টলাইনের দিকে ঠেলে দেয়-আইটি দক্ষতা দিয়েই।তিনি বলেন, ‘মূল বিষয় যানবাহন নয়। আসল হলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং পরিকল্পনা। অপারেটর ও মেশিনের মধ্যে যোগাযোগই সব।’

পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে এখন অবস্থান নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ড্রোন ফুটেজ, ক্ষতিগ্রস্ত মাঠ এবং পূর্ব রেকর্ড করা ম্যাপ মিলিয়ে পথ নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
স্থলভাগে রোবট এখন পদাতিক বাহিনীর মৌলিক কাজও প্রতিস্থাপন করছে। একটি ইউনিট একটি ভারী মেশিনগান বসানো রোবট প্রস্তুত করছে, যা ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি করে এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে পারে। এই রোবটের খাবার, পানি বা বিশ্রামের প্রয়োজন নেই। শুধু গোলাবারুদ শেষ হলেই এটি ঘাঁটিতে ফিরে যায়।
ইউনিটের সদস্যরা জানান, রোবট মোতায়েনের পর শত্রুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তারা দিশেহারা হয়ে যায়। বর্তমানে এমন পাঁচটি মেশিন রয়েছে এবং আরও উন্নত ভার্সন তৈরি হচ্ছে, যা ঘণ্টায় ১০ মাইল গতিতে চলতে পারে এবং কালাশনিকভ বহন করতে সক্ষম। মাত্র কয়েক মাসেই এসব চালকবিহীন যান বিরল প্রযুক্তি থেকে সাধারণ যুদ্ধ সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে।
- বিষয় :
- ইউক্রেন
- রাশিয়া
- সেনা সদস্য
