‘অ-নামিকা’: আলোসঞ্চারী প্রেম
আমিনুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৩ | ১৮:০০
কাজী নজরুল বাংলা ইসলাম সাহিত্যে রোমান্টিকতা ও আধুনিকতার মেলবন্ধন রচনাকারী। এ নিয়ে বুদ্ধদেব বসুরও মূল্যায়ন আছে কিন্তু সেটা নিয়ে এখানে আলোচনার অবকাশ নেই। আধুনিক সাহিত্য রোমান্টিক সাহিত্য থেকে মূলত দু’ভাবে আলাদা। বিষয় হিসেবে আধুনিক সাহিত্য অনেক বেশি ইনক্লুসিভ। জীবনের উজ্জ্বল দিকগুলোর সাথে তার কদর্য বা নেতিবাচক দিকগুলোও এখানে স্বমহিমায় স্থান লাভ করে। অনেক সময় জীবনের নেতিবাচক দিকগুলোই অধিক গুরুত্ব ও কদর পেয়ে থাকে। হতাশা, ব্যক্তিযন্ত্রণা, নিবিড় নৈরাশ্য, সমকাম, পরকীয়া, পতিতাগমন-অভ্যাস, সমাজের প্রতি দায়দায়িত্বহীন মানসিকতা, তীব্র আত্মকেন্দ্রিকতা, সংশয়– এসবই আধুনিক সাহিত্যের সোনালি উপকরণ। সেভাবেই সৃষ্ট হয়েছিল ফরাসি কবি বোদলেয়ারের আধুনিক কাব্য ‘ক্লেদজ কুসুম’। অনুরূপভাবে আধুনিক সাহিত্য যুগপুরাতন কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, বৈষম্যমূলক প্রথা, মানুষে মানুষে কৃত্রিম ভেদাভেদ, রাজস্তুতি এসবকে ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ফেলতে চায়। মুক্তমন ও মুক্তসমাজ আধুনিকতার দাবি। সাহিত্যে আধুনিকতার আরেকটি দিক হচ্ছে প্রকরণ বা আঙ্গিক। এটি সংহত, অনেকটাই নিরাবেগ, অশিথিল, ইঙ্গিতময়, অপেক্ষাকৃত কম অলংকারময় ও বেশি ব্যঞ্জনাগর্ভ। ভাবনায় যিনি আধুনিক নন, কেবল আধুনিক কাব্য আঙ্গিক অনুসরণ করে তার পক্ষে আধুনিক কবিতা রচনা সম্ভব নয়। আমরা সাহিত্যের আধুনিকতা বিচার করতে গিয়ে অধিকাংশ সময় শুধু আঙ্গিকগত দিকগুলো বিশ্লেষণ করি, বিষয়ভাবনার দিকটি বিবেচনায় নেওয়ার কথা ভুলে যাই। কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামকে মূল্যায়নের সময় এ বিষয়টি ঘটে এসেছে সবচেয়ে বেশি। নজরুল তাঁর সাহিত্যভাবনায় এবং ব্যক্তিগত জীবনে একজন আলোকিত আধুনিক মানুষ।
আসলে নজরুলের সাহিত্যে একটা ‘সাহিত্যিক বিদ্রোহ’ ছিল এবং প্রবলভাবেই ছিল। সেটা মূলত অগ্রসর ভাবনার বিদ্রোহ বা আধুনিক ভাবনার বিদ্রোহ। তাঁর কবিতা-গানে বুদ্ধদেব বসু কথিত ‘বাস্তবের ঘনিষ্ঠতা’, ‘সংরাগের তীব্রতা’ এবং ‘জীবনের জ্বালাযন্ত্রণার চিহ্ন’ অত্যন্ত বেশি। নজরুল বাস্তবের মাটি ত্যাগ করে কল্পনার আকাশের অধিবাসী হননি কখনোই। তিনি উড়েছেন কিন্তু মাটির সাথে সম্পর্ক ছেদ করেননি। জীবনের জ্বালাযন্ত্রণাই তাঁর সৃষ্টির মূল প্রেরণা। তাঁর বিদ্রোহ আত্মিক ও সামষ্টিক যন্ত্রণারই উৎসারণ। তাঁর প্রেমভাবনাও হৃদয়িক যন্ত্রণায় রক্তাক্ত। নজরুলের প্রেমের কবিতাগুলোতে মানুষের হৃদয়ের পিপাসার পাশাপাশি শরীরের চাহিদাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত প্রেমের কবিতাগুলোর মাঝেও এসব লক্ষ করা যায়। এখানে শুধু তাঁর ‘অ-নামিকা’ কবিতাটি নিয়ে আলোচনা করা যায়। তিনি তাঁর ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ গ্রন্থের ‘অ-নামিকা’ নামক কবিতায় প্রেম সম্পর্কে ঝুঁকিপূর্ণ সাহস নিয়ে বলেছেন, ‘জন্ম যার কামনার বীজে/ কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে।’ প্রেমের জন্ম কি কামনায়? কাজী নজরুল ইসলাম সে কথাই তো জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি হৃদয়সর্বস্ব রোমান্টিকতাকে উড়িয়ে দিয়ে কবিতায় উদ্ভাসিত করে তুলেছেন রক্তমাংসে গড়া শারীরিক কামনা-বাসনার প্রবল অস্তিত্ব। তিনি সেই কামনা-বাসনাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন প্রতিটি প্রাণে, প্রতিটি অস্তিত্বে, প্রতিটি পিপাসায়। প্রাণী ও উদ্ভিদ সকলের জৈবিক সত্তার মূলে রয়েছে কাম বা যৌনচাহিদা, হৃদয়িক টানের সাথে মিশে রয়েছে শারীরিক তৃষ্ণা, সেটা তিনি প্রবলভাবে উপস্থাপন করেছেন প্রেমের কবিতায়। ‘অ-নামিকা’-তেও। রোমান্টিক প্রেমের কবিতায় একটা অবাস্তব শুচিবায়ুগ্রস্ততা থাকে যা এমন: প্রেমের মানুষটিকে কেবল হৃদয়ে আপন করে পেলেই চলে, তার শারীরিক সংসর্গের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাস্তবতা তেমনটি নয়। কিংবদন্তির লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট, চণ্ডীদাস-রজকিনী প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ভালোবাসার মানুষটিকে শারীরিক সান্নিধ্যে পাওয়ার তীব্র বাসনা ও ঝুঁকিপূর্ণ সাধনা ছিল। শারীরিক চাহিদাবিহীন দুটি মানুষের মাঝে বন্ধুত্ব হতে পারে কিন্তু প্রেম নয়। শুধুই দৈহিক পিপাসা যেমন প্রেম নয়, তেমনি দেহের চাহিদাকে মাইনাস করে প্রেমের দাবিও উর্বর কল্পনামাত্র। রোমান্টিকদের চোখে শিল্পসাহিত্যে অপ্রিয় বাস্তবতার পক্ষাবলম্বন পরিত্যাজ্য, কিন্তু আধুনিকতার কাজ হচ্ছে তাকে স্বীকার করা এবং প্রয়োজনে মহিমান্বিত করা। কাজী নজরুল ইসলামের ‘অ-নামিকা’ কবিতার মাঝে আমরা আধুনিক প্রেমভাবনার দুরন্ত উদ্ভাসন দেখতে পাই।
তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা
গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে লয়ে যায় মোরে!
জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে!
উদ্বেলিত বুক মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা
উদগ্র কামনা
(অ-নামিকা/ সিন্ধু-হিন্দোল)
‘অ-নামিকা’ কবিতা বিষয়ে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে এখানে কল্পনার প্রাধান্য অনেক বেশি; যা সাধারণত রোমান্টিক কবিতার ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। এই অভিমতও সঠিক। কিন্তু নজরুল নরনারীর মনোদৈহিক পিপাসা তাড়িত প্রেমকে ব্যাপক মাত্রা প্রদানের জন্য কবিতার নারী ‘অ-নামিকা’-কে দেখা-না দেখা, অতীতের-বর্তমানের, জন্ম নেওয়া-জন্ম না নেওয়া– সকল নারী-পুরুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এটা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন কল্পনাবিলাস নয়, রোমান্টিক কল্পনা আর আধুনিক বাস্তবতার মধ্যে অভিনব সেতু রচনা। এটা একটা অব্যবহৃতপূর্ব শিল্পকৌশল।
প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন।
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়!
যে পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়!
আধুনিক মানুষ মানেই বহুমাত্রিক মানুষ। লাইলি-মজনুর প্রেমকে নীতিগতভাবে শ্রদ্ধা করলেও এ-যুগের খুব কম মানুষই ‘আমরণ একনিষ্ঠ প্রেম’-এর অনুসারী। মানুষ আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বহুচারী এবং বহুগামী। একজনের সঙ্গে প্রেমে ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি বুকে নিয়ে বাকি জীবন পার করে দেওয়ার মানুষ আজ নেই বললেই চলে। অনুরূপভাবে দু’জন নরনারী প্রেমবন্ধনে জড়িয়ে সংসার করতে করতেও অন্য মানুষের প্রেমে পড়ে এবং এমনটা কারও কারও ক্ষেত্রে একাধিকবারও ঘটে থাকে। পাশ্চাত্য সমাজে ও সংস্কৃতিতে এটা অনেক আগে থেকেই বহুল ঘটিত, বহুচর্চিত এবং অনিন্দিত ব্যাপার। বর্তমানে এটি এশিয়াতে বা আরও বৃহত্তর পরিসরে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে প্রবলভাবে ঘটমান ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নজরুলের ব্যক্তিজীবনেও একাধিক প্রেমের উঁকিঝুঁকি ছিল যদিও সেসব সফল হওয়ার মতো পরিণতি লাভ করেনি। তিনি সেই সময়েই বাস্তবভিত্তিক বহুমাত্রিক বহুরৈখিক বহুগতিক প্রেমের জয়গান গেয়েছেন; যা সমসাময়িক কবিদের সাহসের পরিসীমার বাইরে ছিল বললেও চলে।
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু,
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম–
সে শরাব লোহু।
তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়
ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!
আমরা জানি, রোমান্টিক মন কেবল সুন্দরের অনুসারী কিন্তু আধুনিক মন প্রচলিত অর্থে অসুন্দর এমনকেও সুন্দর করে নিতে পারে। রোমান্টিকতায় ও আধুনিকতায় মেশানো নজরুলের মন। তাঁর সৌন্দর্যচেতনা তাই অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি বলেন: ‘যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন/ যা-কিছু চুম্বন দিয়া করেছি সুন্দর–/ সে সবার মাঝে যেন তব হরষণ/ অনুভব করিয়াছি!’ অনন্য প্রেমভাবনার পাশাপাশি ‘মানস-রঙ্গিণী’, ‘চির-নাহি-আসা’, ‘আদি সৃষ্টি-কাম’, ‘কামনার বীজ’, ‘পবনের যবনিকা’– শব্দের এমন জুতসই ও সাহসী ব্যবহার, ‘বিরহের কান্না ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া’, ‘আকাশ ঢেকেছে তার পাখা কামনার সবুজ বলাকা’, ‘দেহের তীরে পাবার দুরাশা’, “উতারো নেকার’-হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা”, ‘দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্ শরাব’ চিত্রকল্পের এমন অভিনবত্ব, উপস্থাপনায় নাটকীয়তা, ছন্দের লীলা এবং বাস্তবতা ও কল্পনার সমাবেশ ইত্যাদি ‘অ-নামিকা’ কবিতাটিকে একটি শিল্পসফল সৃষ্টিতে উন্নীত হতে সহায়তা করেছে; যা একই অঙ্গে ধারণ করেছে রোমান্টিকতার বাগান এবং আধুনিকতার সৌধ।
- বিষয় :
- প্রচ্ছদ
- আমিনুল ইসলাম
