ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গল্প

জীবন-সংগ্রাম ও সততার গল্প

জীবন-সংগ্রাম ও সততার গল্প
×

জুয়েল আশরাফ

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

ভাদ্র মাস। রোদের তেজ এমনিতেই চড়া। গত কয়েকদিন রাতের দিকে আকাশে মেঘ দেখা গেছে, ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টিও হয়েছে। তবু দিনের তাপমাত্রা কমেনি। সকালে চড়া রোদ বিকেলে কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হওয়ায় রোদের তেজ কিছুটা কমেছে কেননা। শরৎ যে এসেছে ধরায়। কিন্তু ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ রোডের মতো ব্যস্ত রাস্তায় ব্যস্ততা কমেনি। সেদিন তুলনামূলক সুনসান দেখা গেছে সকালে-দুপুরে। বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রীসংখ্যা ছিল কম। হেলমেট তো আছেই, রোদ থেকে বাঁচতে সারা শরীরে কাপড় জড়িয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়েছে অসংখ্য রাইডার। বেড়ে গেছে আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয়ের চাহিদাও।

 যাত্রী না পাওয়ায় রাস্তায় অটোর সংখ্যাও আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় কম। অসুস্থ হয়ে পড়েছে ফাতেক। পেটের রোগের সংক্রমণ ছড়ানোর উপক্রম হয়েছে। তাপদাহ বিপর্যস্ত করেছে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও।

এত অসুস্থতার ভেতরেও সে বেরিয়ে গেছে অটোরিকশা নিয়ে। বাড়ি থেকে নিষেধ করেছিল সবাই। কারওর কথা সে শোনেনি। সব কথা শোনা যায় না। শোনা ঠিকও নয়। পেটের দায়ে সব উপেক্ষা করে এগোতে হয়। অবশ্য সে পেটের দায়ে বেরিয়েছে ব্যাপারটি এমন নয়, একটা দায় থেকে মুক্তি পেতে অসুস্থ শরীর নিয়েও আজ সে রাস্তায়। না হলে মা-বাবার নিষেধ অমান্য করার ছেলে সে নয়।

হিন্দার দিনের অনেকটা সময় রান্নাঘরেই কেটে যায়। বাইরে তাপমাত্রা যেন মরু শহরকেও পাল্লা দিচ্ছে। তার সঙ্গে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। সকালে একবার রান্নাঘরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাড়ির সবার জন্য রান্না তো করতে হবে। মা-বাবা সবাই অসুখে জর্জরিত। তাই ঘেমে-নেয়েও খুন্তি নেড়ে যাচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে ঘড়িতে সময় দেখে যাচ্ছে। দুপুরে ২টায় সে ঠিক পৌঁছে যেতে পারবে তো?

বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা এগিয়েছে হিন্দা। চড়া রোদে মাথা ঘুরে গেল। হাত-পায়ে রোদ লেগে ফোস্কা পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তবু তাকে সময়মতো পৌঁছাতে হবে। গত সপ্তাহে অটোরিকশায় করে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে ডাক্তার দেখাতে। ব্যাগভর্তি টাকা আর মোবাইল ফোন ভুলে ফেলে রেখে যায় অটোরিকশায়। অনেক কষ্ট ক্লেশের পর অটোরিকশা চালকই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। চৌরাস্তায় আসতেই একজন যুবক হাত তুলে ইশারা করল। হিন্দা বাকিটা বুঝে ফেলল।

আমার নাম ফাতেক। আমার অটোরিকশায়ই সেদিন আপনি ব্যাগ ফেলে গেছেন।

হিন্দা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ব্যাগটি হাতে নিল। হাসল অল্প। তাকে কী বলা যায় ভাবছে। ফাতেক বলল, চেক করে নিন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখুন। হিন্দা কিছু বলার মতো খুঁজে পেল। বলল, আমি ব্যাগ খুলে দেখব না। গায়েব করার ইচ্ছা থাকলে আপনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। তবু নিজের জিনিস একবার দেখে নেওয়া ভালো। আমি অপরিচিত মানুষ। আপনি সৎ। এর বেশি কিছু আমি আর বলতে পারব না। হিন্দা লাজুক ভঙ্গিতে হাসল অল্প। ফাতেক অটোরিকশা চালিয়ে চলে গেল। পেছনে হিন্দা তাকিয়ে থাকল নির্ণিমেষ। মানুষটার ফোন নাম্বার তার কাছে আছে। এমন একজন মানুষকে সংসারজীবনে চাইবার দায় তার সব থেকে বেশি। 

সুহৃদ ঢাকা

আরও পড়ুন

×