শিশুর উচ্চতা বাড়াতে খাবার
লিনা আকতার
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৫ | ১১:৩৭
শিশুর উচ্চতা বাড়ার প্রাথমিকভাবে জেনেটিক কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, শিশুর বাড়বাড়ন্তে পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর শারীরিক গঠন বাড়ার জন্য প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। কারণ উচ্চতা বাড়ার জন্য কিছু খাবার হাড়, জয়েন্ট এবং সামগ্রিক শরীরের শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষা করে উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে প্রোবায়োটিক গাঁজনযুক্ত খাবারে পাওয়া যায় এমন সহায়ক ব্যাকটেরিয়া, যা কৈশোরকালের শারীরিক গঠনের সঙ্গে যুক্ত।
সাধারণত মেয়েরা ১০ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত এবং ছেলেরা ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞরা শিশুদের প্রাক-শৈশবে এবং কিশোর বয়সে সুষম খাদ্যের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডিসমৃদ্ধ খাদ্যের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। সুষম খাদ্য গ্রহণের পরও যদি শিশুর উচ্চতা না বাড়ে তাহলে শিশুর অন্তর্নিহিত কারণ থাকতে পারে। আসুন জেনে নেওয়া যাক কোন খাবারগুলো শিশুর উচ্চতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
ডিম: ডিমে ১৩টি অত্যাবশ্যকীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে প্রোটিন ও ভিটামিন ডি অনেক প্রয়োজনীয় শিশুর জন্য। একটি বড় ডিমে ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা শিশুর সঠিক বিকাশের পাশাপাশি টিস্যু মেরামত ও রোগ প্রতিরোধের জন্য অপরিহার্য। এ জন্য শিশুর উচ্চতা বাড়াতে ডিম নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। ডিমে ৯টি অ্যামিনো এসিড রয়েছে, যা মানবদেহ নিজে থেকে তৈরি করতে পারে না, বাইরের খাবার থেকে সংগ্রহ করতে হয়। শিশুর সামগ্রিক বিকাশে ডিম চমৎকার একটি খাদ্য।
দুগ্ধজাত খাবার: দুধে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়ামসহ বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শিশুর বৃদ্ধি ও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, গরুর দুধ শিশুদের পেশি এবং ওজন বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। দুগ্ধজাত খাবারের মধ্যে দই প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। গবেষণা থেকে জানা গেছে, প্রোবায়োটিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, প্রদাহ কমায়। এ ছাড়া দই ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস রয়েছে, যা হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এগুলো শারীরিক গঠনে সাহায্য করে।
মাছ: ছোট মাছে ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা ভিটামিন ডি শোষণে সাহায্য করে। বড় মাছে বিশেষ করে তৈলাক্ত মাছগুলোয় রয়েছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। গবেষণা থেকে জানা গেছে, যেসব শিশুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড কম থাকে তাদের ঘুমের সমস্যা বেশি হতে পারে; যা শিশুর উচ্চতা বাড়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
মুরগির মাংস: মুরগির মাংসে প্রোটিন, নিয়াসিন, সেলেনিয়াম, ফসফরাসের পাশাপাশি ভিটামিন বি১২ বেশি থাকে; যা উচ্চতা বাড়ার ধারা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। এ ছাড়া হাড়ের বৃদ্ধি এবং গঠন নিয়ন্ত্রণকারী অ্যামিনো এসিড টরিনও রয়েছে প্রচুর। এটি শিশুর বিকাশ ও উচ্চতায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
লাল মাংস: লাল মাংসে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং আয়রন রয়েছে; যা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শিশুর শারীরিক গঠন ও বিকাশে সাহায্য করবে। তবে লাল মাংস মাঝারি মাত্রায় সীমিত রাখা ভালো।
পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি: উচ্চতা বাড়াতে পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি সুপারস্টার। কারণ পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজিতে রয়েছে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ। এ ছাড়া রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন কে, যা হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি ও উচ্চতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বাদাম ও বীজ: বাদাম ভিটামিন ই-এর ভালো উৎস, যা একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। বাদাম হাড়ের স্বাস্থ্য উন্নতি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে বাদাম গ্রহণের ফলে অস্টিওক্লাস্ট, যা এক ধরনের কোষ হাড়ের টিস্যু ধ্বংস এবং উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করে। এ ছাড়া বেশির ভাগ বীজে ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা উচ্চতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। যেমন চিয়া বীজ, তিসি বীজ, মিষ্টিকুমড়ার বীজ ইত্যাদি।
ফল: ফল ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের একটি দুর্দান্ত উৎস। বিশেষ করে যারা নিরামিষাশী তারা কিশমিশ, আলুবোখারা, ডুমুর, শুকনো অ্যাপ্রিকটসহ শুকনো ফল খেতে পারেন। এগুলো ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। এ ছাড়া ফলে ভিটামিন সি রয়েছে, যা কোলাজেন সংশ্লেষণের জন্য এবং হাড়ের খনিজকরণের জন্য বিল্ডিং ব্লক হিসেবে কাজ করে।
টিপস
সুষম পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন শিশুর উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। যেমন–
- নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপে অংশগ্রহণ– যেমন সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম নিশ্চিত করা।
- মানসিক চাপ কমানো।
- শিশুর স্ক্রিন টাইম সীমিত করুন, যাতে শিশু বাইরে খেলাধুলায় উৎসাহিত হয়।
- অতিরিক্ত চিনি, লবণ, সোডা, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়র মতো অতিরিক্ত খাবার না গ্রহণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাবার শিশুর শারীরিক গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম নিশ্চিত করা।
লেখক: পুষ্টিবিদ; রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
- বিষয় :
- শিশুর যত্ন
