বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং
স্বপ্নের পথে বাধার দেয়াল
র্যাগিংয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা কাউকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়াতে পারে... ছবি :জেমেনি ন্যানো ব্যানানা ইমেজ মডেল দিয়ে তৈরি
আলাউদ্দিন আলাদিন
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০১ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১১:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
উচ্চ মাধ্যমিক শেষে তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করে রাজ্যের স্বপ্ন নিয়ে। এই স্বপ্নযাত্রার শুরুটাই অনেকের জীবনে নেমে আসে বিষাদ হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আদব-কায়দা’ শেখানোর নামে এক মর্মান্তিক নিপীড়ন বা র্যাগিংয়ের মুখোমুখি হয় তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর হতাশা নিয়ে লিখেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন
বছরের শুরুতেই ফাতিন ভর্তি হলো দেশের নামকরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। গভীর রাতে তাকে হলের সামনের চত্বরে ডেকে নিল এক বড় ভাই। ওখানে গিয়ে যা দেখল তাতে তার পিলে চমকে গেল। ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া প্রায় সব ছেলেই আছে সেখানে। তাদের কেউই স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। সবাইকে নিয়েই হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছে বড় ভাইরা। সেখানে সর্বনিম্ন যে শাস্তিটা দেওয়া হচ্ছে ছাত্রদের তা হলো–কান ধরে এক পায়ে কার্নিশে দাঁড় করিয়ে রেখেছে একজনকে। ফাতিন তা দেখছিল কৌতূহল নিয়ে আর অমনি রাতে তার গায়ে ঢেলে দেওয়া হলো এক বোতল ঠান্ডা পানি। এটাই শেষ নয়, তারপরের কথা বলতে চাইল না ফাতিন। ২. এই ঘটনা রিহানের। সেও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। থার্ড ইয়ার চলছে। বছরের শুরুতে নতুন ছাত্র ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক পৈশাচিক আনন্দে তার মন নেচে ওঠে। মনে পড়ে তিন বছর আগের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ভর্তি হয়ে হলে উঠেছিল রিহান। র্যাগিং নামক বিষয়টির জাঁতাকলে পড়ে সে। ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইরা সেদিন তার সঙ্গে যা করল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সে দিনের কথা কিছুতেই ভুলতে পারে না রিহান। দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও তার বুকটা ব্যথায় ভরে ওঠে। তবে সেই দুঃখ আনন্দে পরিণত হয় যখন নতুন ভর্তি হওয়া কোনো ছেলেকে সে র্যাগিংয়ের চাকায় পিষ্ট করতে পারে। নতুন ছাত্রদের টর্চার করার মজাটা পেয়ে গেছে সেও! রিহান এখন র্যাগিংয়ের নামে নতুনদের ওপর হামলে পড়ে অপার আনন্দে ভাসায় সহপাঠী বন্ধুদেরও।
কখন এবং কোথায় দেয় হানা?
আমাদের দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এ অত্যাচারগুলো হয়ে থাকে শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিকে। কিছু স্কুল-কলেজেও র্যাগিংয়ের শিকার হয় নতুন ছাত্রছাত্রীরা। বড় ভাইরা এই র্যাগ ডে’কে উৎসব হিসেবে মাতে। তারাই মূলত র্যাগ টর্চারের মূল হোতা। সুনির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখ নেই এই মাতাল উৎসবের। সাধারণত শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পর কোনো একদিন হঠাৎ শুরু হয় এই মর্মান্তিক নোংরামি, যা মেনে নিতে পারে না সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো শিক্ষার্থীই!
ইতিহাসের পাঠ
ইতিহাস ঘেঁটে যতদূর জানা যায়, এটা আসলে গ্রিক কালচার। সপ্তম-অষ্টম শতকে খেলার মাঠে টিম স্পিরিট নিয়ে আসার জন্য র্যাগিংয়ের প্রচলন শুরু হয়। র্যাগ শব্দটি মূলত ইংরেজি র্যাগিং থেকেই এসেছে। ইউরোপে এর প্রচলন ঘটে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৮২৮ থেকে ১৮৪৫ সালের দিকে র্যাগ সপ্তাহ প্রচলন ঘটে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিশেষ করে ছাত্র সংস্থা–পাই, আলফা, বিটা, কাপ্পা এই সপ্তাহটির প্রচলন ঘটাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।
তবে মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপ-আমেরিকায় এর যাত্রা হলেও বর্তমানে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশেই এর ব্যবহার সর্বাধিক। বিশেষ করে ভারতে র্যাগিং এখন চূড়ান্ত বাজে আকার ধারণ করেছে। যাদের চোখ-কান খোলা তারা সামাজিক মাধ্যমে কিংবা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চোখ বোলান। তাদের নিশ্চয় মনে আছে যে, কিছুদিন আগে ভারতের এক কলেজছাত্র কী ধরনের র্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিল।
মনোচিকিৎসকের দাওয়াই
যদিও বলা হয় বিনোদনের অংশ হিসেবে র্যাগ ডে উদযাপন করা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তা নতুনদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। মূলত র্যাগ ডে হচ্ছে নতুন ছাত্রদের সঙ্গে আনন্দের মাধ্যমে পরিচয় হয়ে তাদের সংকোচ কাটিয়ে ওঠার দিন। আদৌ কি তা হচ্ছে? দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত এটি হয়ে ওঠে আত্মতৃপ্তি, প্রতিশোধ নেওয়ার দিন। মনোবিজ্ঞানীরা র্যাগিংয়ের কয়েকটি কারণ তুলে এনেছেন। তা হচ্ছে–
১. অবচেতন মনে নতুন শিক্ষার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা।
২. নিজের জীবনের কিছু অতৃপ্ত কামনা-বাসনা, মানসিক ও শারীরিক অতৃপ্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এর মাধ্যমে।
৩. নতুন ছাত্রছাত্রীদের ওপর নিজেদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর ইচ্ছা পোষণ।
৪. সিনিয়র দ্বারা নিজেদের পূর্ব র্যাগিংয়ের প্রতিশোধ নেওয়া।
৫. জোরপূর্বক ভবিষ্যৎ অনৈতিক কাজে সাহায্যকারী হিসেবে তাদের ব্যবহারসহ নানা কারণে র্যাগ পালন করে যায় শিক্ষার্থীরা।
মানসিকতায় তালগোল
বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে তাদের বেশির ভাগই মফস্বল কিংবা অন্যান্য শহর থেকে আসা। আধুনিক দুনিয়ার সঙ্গে তাদের পরিচয়-আলাপ সীমিত। ফলে র্যাগ ডে বিরাট এক প্রভাব ফেলে তাদের ওপর। হঠাৎ করে তারা যখন এমন একটি অবস্থানের মুখোমুখি হয়, তখন স্বভাবতই আঁতকে ওঠে তারা। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয় তখন। অনেকেরই মানসিক শক্তি ভেঙে যায়। ফলে আত্মহত্যার মতো ঘটনারও সূত্রপাত হয় এই র্যাগিং থেকে। কেউ কেউ আবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সারা জীবনের জন্য নিজেকে ঘরকুনো কিংবা বন্ধুত্বহীন করে তোলে। কেউবা এর প্রতিশোধ নিতে অপকর্মেও জড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে পরিচিত যে প্রতিক্রিয়া তা হলো–পরবর্তী বছর সে হয়ে ওঠে প্রতিশোধপরায়ণ। নতুন ছাত্রছাত্রীরা আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ওপর চড়াও হয় সে। নিজে যা সহ্য করেছিল তা দ্বিগুণ আকারে অন্যের ওপর ফিরিয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে তার।
গুড ডে হোক র্যাগ ডে
নানা দুর্ঘটনার পর কিছু বিশ্ববিদ্যালয় র্যাগ ডে’র বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা নিয়েছে। তাই বলি, র্যাগ ডে, গুড ডে। এই দিনটা হোক শুধু আনন্দ-উপভোগ আর নিখাদ বিনোদনের। এ দিনের মাধ্যমে দূর হয়ে যাক সব কষ্ট, বেদনা আর দুঃখ। এমন চাওয়াটা নতুনদের মতো করে বড় ভাইদেরও হোক। ছোট ভাইবোনদের প্রতি আমরা বড় ভাইরা হব আরও সহজাত, আবেগপ্রবণ এবং কোমল।
- বিষয় :
- বিশ্ববিদ্যালয়
- র্যাগিং
