ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ 

সমকাল আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ 
×

সমকাল কার্যালয়ের সভাকক্ষে ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক (সাজ্জাদ নয়ন)

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ২০:১৪ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ২০:৩৬

বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়। এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জাতীয় সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, সমন্বিত যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে সকলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ের সভাকক্ষে ‘স্বপ্ন ও সংকট: বাল্যবিবাহ এবং কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে তারুণ্যের অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মী ও তরুণ প্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন। দৈনিক সমকাল ও রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে এবং ইউথ শেয়ার-নেট প্রকল্প ও অ্যামপ্লিফাইচেঞ্জের সহযোগিতায় গোলটেবিলটি আয়োজিত হয়। 

রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের জেন্ডার অ্যান্ড এসআরএইচআর বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. হালিদা হানুম আক্তারের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) মতিউর রহমান। ইউথ শেয়ার-নেট প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরেন রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের পরিচালক (স্বাস্থ্য ও জেন্ডার) খালেদা ইয়াসমিন। মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব (পরিকল্পনা) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের অ্যাডজাঙ্ক্ট ফ্যাকাল্টি ডা. সারোয়ার বারী। সঞ্চালনা করেন সমকালের সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন।

গোলটেবিলে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মতিউর রহমান বলেন, পরিবারে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ার সংস্কৃতি এখনও বড় বাধা। জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। তরুণদের জন্য সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার পরিকল্পনা তৈরি এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ইউটিউব, টিকটক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণদের কাছে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। 

সভাপতির বক্তব্যে ডা. হালিদা হানুম আক্তার বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে মাতৃত্বের হার এখনও উদ্বেগজনক। এটি মোকাবিলায় নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যমান আইন ও কৌশলের কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। 

মূল প্রবন্ধে ডা. সারোয়ার বারী বলেন, বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১ শতাংশের বেশি, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, লিঙ্গবৈষম্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্যের অভাব, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধানের অপব্যবহার বন্ধ, স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি, কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ছেলে ও পুরুষদের সম্পৃক্ত করতে হবে। 

ইউথ শেয়ার-নেট প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরে খালেদা ইয়াসমিন জানান, ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৮ সাল পর্যন্ত দেশের পাঁচটি বিভাগে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করবে। গবেষণা, কমিউনিটি সংলাপ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নীতিগত অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে তরুণদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে সচেতন করে তোলাই এর লক্ষ্য।

উন্মুক্ত আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে অনেক তথ্য থাকলেও সেগুলো এখনো প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। তরুণদের সামনে শিক্ষা, কর্মজীবন ও নেতৃত্বের ইতিবাচক রোল মডেল তুলে ধরার পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর যোগাযোগ কৌশল নিতে হবে। 

আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. সাঈদ রুবায়েত বলেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। তাই অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন কৌশল প্রয়োজন। শিক্ষা, নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, জেন্ডার সমতা ও তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে বহুমন্ত্রণালয়ভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। 

ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের এসআরএইচআর বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ হাসান বলেন, বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ মূলত জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সংকট। অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এতে কিশোরীদের শিক্ষা, বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সিরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত বলেন, নারীদের সক্ষমতা সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে। নারীর নেতৃত্ব, কেয়ার ইকোনমিতে অবদানের স্বীকৃতি এবং গণমাধ্যমে ইতিবাচক উপস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

দলিতের হেড অব প্রোগ্রাম তপন কুমার বলেন, দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাল্যবিবাহের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। দারিদ্র্য, শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, জলবায়ুজনিত সংকট এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞানের অভাব এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইপসার পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু চট্টগ্রামের পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, দুর্গম এলাকায় তথ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা কিশোরীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় সচেতনতা কার্যক্রম এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। 

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নারী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস নাসরিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, পারিবারিক দিকনির্দেশনার অভাব এবং জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করছে। এটি প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রতিনিধি হেমা চাকমা পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি পাহাড়ের সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অনেক এলাকায় এখনো মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছেনি। বহু বাল্যবিবাহ প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে থেকে যায়। তাই শুধু শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি নয়, সামাজিক মানসিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন জরুরি। তরুণদের কাছে পৌঁছতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক সৃজনশীল প্রচারণা চালাতে হবে। 

ন্যাশনাল ইয়ুথ কোয়ালিশন অন পপুলেশন, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এসআরএইচআর-এর কাউন্সিল সদস্য শেখ রিফাদ মাহমুদ বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনেক কিশোর-কিশোরী পরিবারের অমতে বিয়ে করছে, যা পরবর্তীতে নানা সামাজিক সংকট সৃষ্টি করছে। তিনি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আভাস-এর প্রজেক্ট অফিসার ময়ূরি আক্তার টুম্পা বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে জ্ঞানের বড় ঘাটতি রয়েছে। তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে সক্রিয় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ওয়াইএডি-এর সভাপতি মোনতাহের আরাফাত বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীরাই নিজেরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অথচ দেশে বিদ্যমান কিশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী অবগত নয়। একই সঙ্গে মাসিক স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রান্তজ যুব সংঘের সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক মাহমুদ বলেন, নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। তিনি বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা কার্যকরভাবে পাঠদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

সমাপনী বক্তব্যে রেডঅরেঞ্জ লিমিটেডের পরিচালক (প্রোগ্রাম অপারেশনস) আলোক কুমার মজুমদার বলেন, বাল্যবিবাহ, কিশোরী গর্ভধারণ এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকারসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল আইন বা কর্মসূচি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। এর জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল জনগোষ্ঠী পর্যন্ত সবার মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সামাজিক কুসংস্কার ও প্রচলিত রীতিনীতির পরিবর্তন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হবে না।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন

×