আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শিরোনামে মতবিনিময় সভায় বক্তারা -সমকাল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:০৯ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শিরোনামে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের সহযোগী ছিল দৈনিক সমকাল এবং চ্যানেল টোয়েন্টিফোর। সভায় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।
তাসকীন আহমেদ
সভাপতি, ডিসিসিআই
ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য রাজস্ব আহরণ পদ্ধতির অটোমেশন, সহজীকরণ এবং করজাল সম্প্রসারণ একান্ত অপরিহার্য। টেকসই ও স্থিতিশীল আর্থিক খাতের জন্য নীতির আধুনিকায়ন, খেলাপি ঋণ কমানো ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা দরকার। উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন করতে হবে। বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নীতি সুদহার কমাতে হবে। শিল্প ও বাণিজ্য শক্তিশালী করতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পণ্যের বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ খুব প্রয়োজনীয় বিষয়। সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাতগুলোতে বাজেটে নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। অবকাঠামো খাতে টেকসই উন্নয়ন বিশেষ করে পরিবহন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, অবকাঠামো বন্ড চালু এবং জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখতে জ্বালানি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কার্যকর নীতিসহায়তা দিতে হবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, এমপি
বাণিজ্যমন্ত্রী
এত বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যেও করদাতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম, যা কাম্য নয়। রাজস্বব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে করের আওতা বাড়ানো জরুরি। তবে ব্যক্তির ওপর করের চাপ বাড়ানো সরকারের উদ্দেশ্য নয়; বরং করজালের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করাই মূল লক্ষ্য। ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো করের ‘খড়্গ’ আসবে না। শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা অপরিহার্য। সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা ঘরে বসেই লাইসেন্স ও নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেন। আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট আইআরসি ও ইআরসি সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে।
মাহবুবুর রহমান
সভাপতি, আইসিসি বাংলাদেশ
আমাদের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। নিয়মিত করদাতাদের ওপরই বারবার করের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। অথচ অনেকেই করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বাজেট প্রণয়ন সরকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য সমানভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। সরবরাহ শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা রপ্তানিমুখী শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঋণের উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ হ্রাস এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত, সময়সীমাবদ্ধ ও কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
ড. মনজুর হোসেন
সদস্য, পরিকল্পনা কমিশন
আমরা সবাই জানি, বর্তমানে অর্থনীতি ভঙ্গুর ও মন্দা অবস্থায় রয়েছে। বর্তমান সরকার চাইছে আগামী বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতির মন্দা অবস্থাকে একটি ভালো প্রবৃদ্ধির ধারায় নিয়ে যেতে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। দ্রুত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করানো না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়বে। আমি মনে করি, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে এমএসএমই খাতকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
হোসেন খালেদ
সাবেক সভাপতি, ডিসিসিআই
আমাদের ব্যবসা শুরুটা যেমন সহজ করা দরকার, ব্যবসা করাটাও তেমনি সহজ করা দরকার। আবার ব্যবসা যদি বন্ধ করতে হয়, সেটিও সহজ করা দরকার। ব্যবসা করার জন্য ব্যয় কমাতে অনেক জায়গায় কাজ হয়েছে। এখনও উন্নতির অনেক সুযোগ আছে। একটা কথা আমরা সবসময় বলে এসেছি, কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমানো দরকার। স্বচ্ছতার জন্য আমাদের লেনদেন ‘ডিজিটাইজ’ করতে হবে। শতভাগ অনলাইনে কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অপ্রদর্শিত আয় যথাসম্ভব জরিমানা করে বিনিয়োগে আনা যেতে পারে। তা না হলে এসব অর্থ পাচার হয়ে যাবে। এখনও দেশের মোট লেনদেনের মাত্র ৩০ শতাংশ হচ্ছে আনুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে। বাকি ৭০ শতাংশ নগদ। এখান থেকে বের হতে ডিজিটাল ইকোনমি চালু করতে হবে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ওপর কর থাকা উচিত নয়। ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা খুব জরুরি। এ জন্য করপোরেট কর কমানো উচিত।
রিজওয়ান রাহমান
সাবেক সভাপতি, ডিসিসিআই
এনবিআর স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে শুধু বড় করদাতাদের দিকে নজর দেয়। এটি ভুল পথ। দীর্ঘদিন ধরেই করব্যবস্থার অটোমেশন নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো অটোমেশন হলে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিতে পড়বেন রাজস্ব আহরণকারী কর্মকর্তারা। কারণ রাজস্ব কর্মকর্তারা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা বোনাস হিসেবে পেয়ে থাকেন। কর দেন ব্যবসায়ীরা, আর সুবিধা পান কর্মকর্তারা। কর আদায় ব্যবস্থা ঢাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এনবিআর বিকেন্দ্রীকরণ করতে ব্যর্থ। রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতির কারণে সরকার প্রয়োজনীয় খরচ করতে পারছে না। তবে এটি মাথায় রাখতে হবে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির খরচ মেটাতে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া সরকারের উচিত হবে না।
শামস মাহমুদ
সাবেক সভাপতি, ডিসিসিআই
টানা ৮ মাস রপ্তানি আয় কমেছে। আগামীতে আরও কমতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন ইপিআর (এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেনপনসিবিলিটি)
বাধ্যতামূলক করবে, তখন পোশাক কারখানাগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন খুব ভালো সিদ্ধান্ত। তবে এক সময় তো উত্তরণ করতে হবে। এ কারণে প্রস্তুতি গ্রহণ অপরিহার্য। বিশেষ করে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে নজর দিতে হবে। ডি-কার্বনেজাইনেশন প্রভাব মোকাবিলার পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিনিয়োগের চেয়ে বিদেশি বিনিয়োগে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণা থেকে বের হতে হবে। শিল্প খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গ্যাসের লাইন দিলে হবে না, গ্যাসের চাপ থাকতে হবে। সিস্টেমলস কমাতে হবে। টার্নওভার কর বাড়ানোর চিন্তা থেকে বের হতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।
ডেভিড হাসনাত
সভাপতি, বিআইপিপিএ
দেশে এত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকতেও লোডশেডিং কেন হয়? এর প্রধান কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সংকট। গ্যাসের নিজস্ব উৎপাদন খুব কম। আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে দেশ। অন্যদিকে স্থলভূমিতে এলএনজি টার্মিনাল না থাকার কারণে সংরক্ষণও কম। স্থলভূমিতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সাত বছর আগে টেন্ডার আহ্বান করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত এলএনজি সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে জ্বালানি কিনে মজুত করা সম্ভব হচ্ছে না। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সৌদিভিত্তিক আরামকো যৌথ উদ্যোগে বড় রিফাইনারি করতে চেয়েছিল। অজানা কারণে তা হয়নি। কারখানায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গ্যাসের সরবরাহ দিয়ে অর্থনীতি চলতে পারে না।
মো. সবুর খান
সাবেক সভাপতি, ডিসিসিআই
স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহ না দিলে অর্থনীতি দীর্ঘ মেয়াদে টিকবে না। স্থানীয় শিল্পের বিকাশে কর এবং অন্যান্য প্রণোদনা দিতে হবে। আমি এখানে ছোট একটি উদাহরণ দিতে চাই। হাইটেক পার্কে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছিল। এনবিআরের সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগকারীরা উৎপাদনে যেতে পারছে না। তাদের সরকার যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার অনেক কিছুই রাখা হয়নি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট খাতে আমাদের আমদানি নির্ভরতা কমেনি। হাইটেক পার্কের সমস্যার সমাধান দরকার। আরেকটি বিষয় হলো স্থানীয় উদ্ভাবনে কর ছাড় বা অন্য প্রণোদনা দিতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমেও আমদানি নির্ভরতা কমানো যাবে।
ড. আখতার হোসাইন
প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক
রাজস্ব নীতি এবং মুদ্রানীতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে দেখা যায়, রাজস্ব নীতি অনেক সময় মুদ্রানীতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। যে কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ঊর্ধ্বমুখী থাকে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ যত কম নেওয়া যায়, ততই ভালো। সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ কম নিলে সেই তহবিল বেসরকারি খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। আমি মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় জনতুষ্টিমূলক বাজেট না দিয়ে সংকোচনমূলক করতে হবে। এমন বাজেট প্রণয়ন করা ঠিক হবে না, যাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়ে। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ৫ থেকে ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ বড় ভরসা।
মো. কাউসার আলম
সভাপতি, আইসিএমএবি
একদিকে দেশের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত কমছে। এটি একটি ধাঁধা। কর সংগ্রহ কীভাবে বাড়ানো হবে, তা করনীতিতে থাকতে হবে। করনীতি এবং কর প্রশাসন আলাদা করার প্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে। কর সংগ্রহ বাড়ার অন্যতম শর্ত হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো খুব প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দিক থেকে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। আগামী বাজেটে এমন উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যা দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। কর সংগ্রহ বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল করনীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
জহিরুল আলম
নির্বাহী পরিচালক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর
গণমাধ্যম সব সময়ই ব্যবসায়ীদের ধারণা তুলে ধরে। এবারের বাজেট সামনে রেখে একই কাজ করছে গণমাধ্যম। এখানে যেসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার সবই আমাদের জানা। আমার কাছে মনে হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি প্রতিরোধ নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আমরা এমন একটি সময়ে এই আলোচনা করছি, যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। বর্তমান সরকার অর্থনীতিকে ভালো অবস্থায় পায়নি। ব্যাংক খাত এবং জ্বালানির সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে না পারলে সমস্যা বাড়বে। যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা বাজেট তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইমরান করিম
চেয়ারম্যান, কনফিডেন্স গ্রুপ
আমরা উৎপাদক হিসেবে বর্তমানে ব্যবসা করি মূলত ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করার জন্য এবং এনবিআরকে কর পরিশোধ করার জন্য। তাদের হাতে প্রকৃত অর্থে মুনাফা তেমন কিছু থাকছে না। এভাবে ব্যবসার বিকাশ হয় না। যেখানে পুঁজি বাড়ে সেখানে ব্যবসা চলে যায়। এটি দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আমাদের পুঁজিবাজারেও সমস্যা আছে। আমাদের দেশের অবস্থাপন্ন মানুষেরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে না। কারণ কারও আস্থা নেই। প্রতিটি দেশে পুঁজিবাজারের প্রবৃদ্ধির পেছনে থাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আমাদের দেশে ধনীরাই আসেন না, মধ্যবিত্তরা তো দূরের কথা।
বেনজীর আহমেদ
সাবেক সভাপতি, ডিসিসিআই
আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ পেছানোর চেষ্টা করছি। সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। আমার কাছে মনে হয়, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে তিন বছরের বেশি বাড়তি সময় পাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে ২০২৯ সালে আমাদের এলডিসি তালিকা থেকে বের হতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমরা ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা সম্মেলন থেকে যে সুবিধা এনেছিলাম, সেটিই এখন পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। এলডিসি থেকে বের হলে আমরা অনেক সুযোগ হারাব। এ কারণে আমাদের যথাযথ প্রস্তুতির বিকল্প নেই।
মমিনুল ইসলাম
চেয়ারম্যান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ
দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান অবস্থা থেকে বের করতে চাইলে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার লাগবে। সম্প্রতি নতুন অর্থমন্ত্রী একই কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের দরকার মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়। সরকারের অর্থায়ন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে কীভাবে পুঁজিবাজার থেকে করতে পারি, তার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বড় প্রকল্পের অর্থায়ন পুঁজিবাজার থেকে নিতে হবে। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিয়ে সরকারের অব্যবহৃত ও পতিত জমিতে কীভাবে আবাসন করা যায়, ভাবতে হবে। পুঁজিবাজার থেকে এখানে অর্থায়ন করা যেতে পারে। এসএমই খাত কর্মসংস্থানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসএমই প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের স্বচ্ছতার জন্য সব মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠানের বাজেট এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এতে করে তাদের জবাবদিহি বাড়বে।
ব্যারিস্টার মো. সামির সাত্তার
সাবেক সভাপতি, ডিসিসিআই
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম। এর মূল কারণ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার অনেক বড়। এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি এবং ছাড়। অন্যদিকে অটোমেশনের ঘাটতি কর সংগ্রহ কম থাকার আরেকটি কারণ। করজাল বাড়ানো ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব নয়। ঢাকা চেম্বারের এক স্টাডিতে দেখা গেছে, মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ কর আহরণের প্রায় ৮০ শতাংশ ঢাকা থেকেই আসে। তাহলে বাকি বাংলাদেশ গেল কোথায়। এ অবস্থায় কর সংগ্রহের জন্য এনবিআরকে ঢাকার বাইরে নজর দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় কী কী ব্যবসা চলছে, তার ম্যাপিং করতে হবে। বারবার একই করদাতাদের কাছে গিয়ে সার্বিকভাবে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে না।
শামীম আহমেদ
সভাপতি, বিপিজিএমইএ
শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, এনবিআরকেও কমপ্লায়েন্ট হতে হবে। দেশের জিডিপিতে অন্যতম ভূমিকা রাখা সেবা ও কৃষি খাত থেকে সরকারের আয় আসছে খুব কম। এদিকটায় নজর দিতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কথা বলে কেবল শিল্প খাতের ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। এদিকে রপ্তানি নীতিতে থাকলেও প্লাস্টিক খাতের প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকে এই খাতের রপ্তানি হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। এই খাত থেকে প্রতি বছর দুই বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হচ্ছে। অথচ ইপিবি দেখাচ্ছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া প্লাস্টিক খাতের কাঁচামাল আমদানির পর ‘অ্যাসেসমেন্ট’ করা হচ্ছে ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দরে। আগামী বাজেটে এসব সমস্যার সমাধান চাই।
শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন
কয়েক বছর সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় স্টিল খাতের চাহিদা কমেছে। এক সময় চাহিদার কারণে আমরা সক্ষমতা বাড়িয়েছিলাম।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তার ব্যবহার করা যায়নি। এ কারণে স্টিল খাতের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট তো আছেই। এদিকে ডলারের দাম বেড়ে কাঁচামালের আমদানি খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই অবস্থার মধ্যে ব্যাংকগুলো ঋণের সীমা বাড়ায়নি, বরং সংকুচিত করেছে। আবার ব্যবসা কমলেও সরকারের কর আদায় কমেনি। ফলে শিল্প খাতে তীব্র চাপে রয়েছে। স্টিলশিল্প বর্তমানে ‘আইসিইউ’ অবস্থায় রয়েছে। আমাদের যে সক্ষমতা রয়েছে, তা আমরা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছি না।
শরীফ জহির
চেয়ারম্যান, ইউসিবি
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত খুবই সমস্যাগ্রস্ত। একটি রাজনৈতিক সরকারকে সফল হতে আর্থিক খাতকে সহায়তা দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাংলাদেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং পাকিস্তানে খেলাপি ঋণের হার বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে মূলধন খাটানো অত্যন্ত দুর্বল। সামগ্রিক ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। আমি মনে করি, ব্যাংকের মন্দ ঋণ কমানোর একটা সম্পদ পুনরুদ্ধার কাঠামো তৈরি করতে হবে। ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থায় বিদেশি ব্যাংকগুলো ক্রেডিট লাইন কমিয়ে দিচ্ছে। পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর যার প্রভাব পড়ছে। সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ কম নিতে হবে। কর আদায় ব্যবস্থাপনা ডিজিটাইজেশন করতে হবে। স্বচ্ছতা বাড়াতে পুরো লেনদেন ব্যবস্থাপনাকে ‘ক্যাশলেস’ করতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ছাড়া অর্থনীতিকে খুব বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
শাহেদ মুহাম্মদ আলী
সম্পাদক, সমকাল
ঢাকা চেম্বার, সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফার-এর যৌথ উদ্যোগে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা এখানে উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী বেসরকারি খাতের কথা শুনেছেন। আমরা আশা করি তিনি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি ও সুপারিশ আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য উদ্যোগ নেবেন।
আগামী বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার নিশ্চয় বেসরকারি খাতের প্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দেবে। সংবাদপত্র হিসেবে আমাদের চাওয়া, সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে।
ঢাকা চেম্বারের
প্রস্তাবনা
আয়কর ও ভ্যাট
lকরমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা করা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫% রাখা
lনন-লিস্টেড কোম্পানির করহার লিস্টেড কোম্পানির অনুরূপ করা
lপূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড করপোরেট কর রিটার্ন পদ্ধতি চালু করা
lআমদানি পর্যায়ে আগাম কর উৎপাদনকারীদের জন্য পর্যায়েক্রমে বিলুপ্তি ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য কমানো
lভ্যাট সংগ্রহে অনলাইন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ চালু করা
lঅগ্রিম ভ্যাট ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে পণ্য বা সেবার চূড়ান্ত মূল্যের ওপর ভ্যাট নির্ধারণ করা সিঙ্গেল স্টেপ রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা
আর্থিক খাত
lস্থানীয় বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির জন্য নীতি সুদহার কমানো
lসরকারি ঋণ গ্রহণে দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো
lউৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক
পুনঃঅর্থায়ন
lক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন চালু করা
lকরপোরেট গভর্ন্যান্স, সুপারভিশন এবং মনিটরিং বাড়ানো
lদীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে নতুন আইপিও বাড়ানো এবং বড় প্রতিষ্ঠান ও এসএমইর তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করা ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ড চালু করা
শিল্প ও বাণিজ্য
lচামড়া শিল্প উন্নয়নে কার্যকর সিইটিপি স্থাপনে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও ব্যক্তি পর্যায়ে ইটিপি স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা
lকৃষিপণ্যের প্রসারে পণ্যভিত্তিক কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন করা
lএলডিসি থেকে উত্তরণের আগে মেধাস্বত্ব ইকোসিস্টেম তৈরিতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান
lহালকা প্রকৌশল শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিটাকের কাঁচামাল ব্যাংকের সরবরাহ সারাদেশে নিশ্চিত করতে বাজেট বরাদ্দ রাখা
lসেমিকন্ডাক্টর খাতের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত পার্কের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা
lউৎপাদনমুখী সিএমএসএমইর উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং জ্বালানির দামের অস্থিরতা মোকাবিলায় ৫ থেকে ৬% সুদহারে চলত মূলধন দিতে বাজেটে বরাদ্দ রাখা
lওষুধ শিল্পের বিকাশে মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা নিশ্চিত করা
অবকাঠামো খাত
lবিনিয়োগ উৎসাহিত করতে উচ্চমূল্যের নির্মাণ উপকরণ এবং মেশিনারির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় নিশ্চিত করা
lইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড, সুকুক ও অন্যান্য ইনোভেটিভ ফাইন্যান্সিং মডেল চালু করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো
lজ্বালানির দাম অনুমানযোগ্য রাখতে রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
lপ্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নে মিতব্যয়ী হওয়া এবং প্রকল্পগুলো মনিটরিং ও ইভালুয়েশনে রিয়েল টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু করা
lসেবা খাতের তথ্য সংরক্ষণে উচ্চ নিরাপত্তার ডেটা সেন্টার স্থাপন। নতুন মেগা প্রকল্প নেওয়ার চেয়ে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ নিশ্চিত করা
- বিষয় :
- বাজেট
