ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল-কারিতাস গোলটেবিল বৈঠক

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনের সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৯:১৮ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১৯:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

করুণার জায়গা থেকে কর্মের জায়গায় ফিরতে চান দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। তারা চান গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং তাদের ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হোক। যারা স্বল্প প্রতিবন্ধী, তাদের ভাতার চেয়ে চাকরিসহ সমাজের সর্বস্তরে প্রবেশগম্যতা বাড়ানো হোক। শিক্ষার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হোক। তাদের নিয়ে যে পরিকল্পনা নেওয়া হবে, তা যেন সমন্বিত হয়। খাতওয়ারি বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়ে এটা করা সম্ভব বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও এর সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভবের কথা জানান। 

‘প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা’ শিরোনামে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রান্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মুখোমুখি আলাপে এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সমকাল কার্যালয়ে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে কারিতাস বাংলাদেশ ও সমকাল।

আলোচনায় সরকারি উদ্যাগের নানা ঘাটতির পাশাপাশি জানা গেছে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা, ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, প্রতিবন্ধীদের চলাচল সহজ করতে হুইলচেয়ার বিতরণের উদ্যোগসহ প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের জন্য স্টেডিয়াম কমপ্লেক্স তৈরির অগ্রগতি সম্পর্কে। 

সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মো. মোশাররফ হোসেন। 

আলোচনার সূত্রপাত করে সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কেবল নীতিগত আলোচনা নয়। এটি আমাদের মানবিকতা, রাষ্ট্রচিন্তা ও জীবনদর্শনের একটি বড় পরীক্ষা। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় যখন সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্যও আমরা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করতে পারি।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করতে নির্ভুল তথ্য জরুরি। কারণ সরকারের সামর্থ্য সীমিত, সাধ অনেক। ফলে শিক্ষা, স্বার্থ, যোগাযোগ– কে বেশি পাবে, সে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক। বিভিন্ন দেশে সরকারের পাশাপাশি করপোরেটও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এগিয়ে আসে। আমাদের দেশেও তা হতে পারে। যেমন জনপরিসরে প্রবেশগম্যতা বাড়ানো, শিক্ষার ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ কাজে তারা এগিয়ে আসতে পারে। 

সম্প্রতি সরকার বয়স্ক ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা ৬১ থেকে বাড়িয়ে ৬২ লাখ এবং ভাতা ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান সমাজকল্যাণ সচিব। তিনি বলেন, আগামী বছর বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯ থেকে ৩০ লাখ করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষা ভাতাও বাড়ছে। 

মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, সাভারে প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের জন্য থাকার জায়গাসহ স্টেডিয়াম করা হচ্ছে। তিনি জানান, গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তালিকা আলাদা করা হবে এবং সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

কারিতাস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক দাউদ জীবন দাশ বলেন, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য কারিতাসের দুটি বিশেষ প্রকল্প রয়েছে। কারিতাস বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে সরকারের সঙ্গে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করার।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরকারি ভাতার পরিমাণ মাসিক ৯০০ টাকা, প্রবীণ ব্যক্তিদের ৬০০ টাকা। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ কয়েকটি দেশের ভাতার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি ভাতার পরিমাণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, প্রতিবন্ধিতার তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চার ভাগে ভাগ করেছে নেপাল। যারা সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধী তারা লাল ক্যাটেগরিভুক্ত এবং তাদের মাসিক ভাতা ৩৪০০ টাকার সমপরিমাণ। এর পর আছে নীল ক্যাটেগরি; তুলনামূলক কম তীব্রতার প্রতিবন্ধীরা। পাঁচটি দেশের তুলনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ভাতার পরিমাণ বেশ কম। 

বাংলাদেশের ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতা আমলে নেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়। বিভিন্ন সংস্থার উপাত্তের ভিন্নতার কারণ; সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য অনুসারে জরিপ পদ্ধতি ভিন্ন হয়। 

আলবার্ট মোল্লা বলেন, বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মার্চ মাসের গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ পরিবারের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। যারা গুরুতর প্রতিবন্ধী তাদের পরিবারের জীবনযাত্রায় ব্যয় আরও বেশি; ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এতে এসব পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যায়। 

মূল প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনায় সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজমুল বারী বলেন, বিভিন্ন রকমের হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৩৯ লাখ থেকে দুই কোটি। সংখ্যাটা আসলে কত? তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে যারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেখাশোনা করে তাদেরও ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। 

ভাতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রতিবন্ধী শাহানারা খাতুন বলেন, শিক্ষিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চাকরিতে গ্রহণযোগ্য সুযোগ থাকা দরকার। শিক্ষা ভাতা পেতে সমস্যার কথা তুলে ধরেন কানিজ ফাতেমা আশা। তিনি বলেন, অনেক সময় এক মাসের টাকা পেতে দুই-তিন মাস লেগে যায়।

ড্রিম ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক নূর মোহাম্মদ বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সব দেখা সম্ভব না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমাদের স্বাস্থ্যসেবা দেবে। পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পরিবহন সেবা পাব। প্রতিটি মন্ত্রণালয় যদি ভাগ করে নেয় তাহলে আমাদের ‍দুর্ভোগ কমে আসবে। ঢালাওভাবে ৯০০ টাকা ভাতা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সব প্রতিবন্ধী ভাতা নিতে চান না। যারা নেন, তাদেরটা একটু বাড়িয়ে দেন। 

বরিশাল থেকে মনিরা আক্তার বলেন, মাস্টার্স পাস করেও চাকরি হয় না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের। ভাতা বড় কথা নয়; অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় জোর দেন তিনি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শফিউদ্দিন বলেন, ৯০০ টাকা ভাতায় চলছে না। শিক্ষা ভাতাও বাড়িয়ে দিতে দাবি করেন তিনি।

ভাতা নিয়ে সমস্যার কারণ জানিয়ে সুরাহার কথা জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ভাতা নিতে না চাওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তবে অনেক প্রতিবন্ধী পরিবারের জন্য ভাতা অনেক বেশি দরকার। 

জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যার বিভ্রান্তি এড়াতে সব তথ্য এক জায়গায় আসা উচিত বলে মনে করেন মোশাররফ হোসেন। উপবৃত্তি ও ভাতা সুবিধার মধ্যে সমন্বয় করতে  নতুন নীতিমালা এই অর্থবছরে বাস্তবায়িত হবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দি চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস-বিস্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, বাজেটের কর্মপরিকল্পনা মনিটর করার কোনো পদ্ধতি নেই। ২০০০ সালেই ভাতা ২৫০০ টাকা হওয়ার কথা। অথচ এখনও ৯০০ টাকা। এটা কী হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?

উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, আমাদের কণ্ঠ সবল হলেও আমাদের পরিচয় দুর্বল করে রাখা হয়। নিজের শিক্ষাজীবনের বর্ণনা দিয়ে মিষ্টি বলেন, প্রতিবন্ধী মানে ব্যাকবেঞ্চার না; টপারও। সব প্রতিবন্ধী ভাতা নিতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সরকারকে কর দিতে চাই। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের মধ্যে আনতে হবে। তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। 

আলোচনায় অংশ নেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং স্পেশালিস্ট অসীম ডিও, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দি চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস-বিস্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক ও সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহাবুব, সাইটসেভার্সের ক্যাম্পেইন অ্যাডভাইজার অয়ন দেবনাথ, কারিতাস বাংলাদেশের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ইনচার্জ চন্দ্রমনি চাকমা, ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (বার্ডো) নির্বাহী পরিচালক সাইদুল হক, সিবিএম গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশনের অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন ম্যানেজার দেওয়ান মাহফুজ-ই মাওলাসহ উপস্থিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। 

আরও পড়ুন

×