ছয় নবজাতকের মৃত্যু
নানা অসংগতি মিলেছে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে
ফাইল ছবি
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ০৯:০২
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নির্মাণত্রুটিসহ নানা অসংগতি রয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর দায়িত্ব পালনে গাফিলতিরও প্রমাণ মিলেছে। তবে ঠিক কী কারণে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ওই হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে, মারা যাওয়া এক নবজাতকের বাবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
গত বুধবার ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা ওই হাসপাতালে একাধিকবার পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা এবং ওয়ার্ডের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত বিষয় খতিয়ে দেখেছেন তারা। আগামী বুধবার তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নবজাতক রাখা হয়েছিল, সেখানে কিছু নির্মাণত্রুটি এবং নিরাপত্তাবিষয়ক দুর্বলতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা ও তদারকির ঘাটতির বিষয়ও সামনে এসেছে।
হাসপাতাল-সংলগ্ন মেডিকেল কলেজ ভবনের ভেতরে একটি বেকারির কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। সেখান থেকে গ্যাস বা রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়ে নবজাতকদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরিবেশগত বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণের কাজ করছেন।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে একক কারণ নাকি একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে, তা নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
এদিকে ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে তদন্ত চালালেও সেই প্রতিবেদনের তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত সপ্তাহে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য ও
পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তদন্ত কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. মহসীন সমকালকে বলেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলছি। বুধবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তখন বিস্তারিত জানানো যাবে।
৩ লাখ টাকা জরিমানা
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ মিটার না থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত যৌথ অভিযান চালিয়ে এ জরিমানা করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শনের সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি হাসপাতাল
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে আসে। গতকাল দুপুরের পর প্রতিবেদন প্রকাশের কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান হাসপাতালের এইচআর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল। তিনি বলেন, প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদনে কী পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির এক সদস্য সমকালকে জানান, তাদের তদন্তে গুরুতর কোনো অসংগতি পাওয়া যায়নি। এমনকি মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
মেডিকেল কলেজ ভবনে বেকারি
আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ভবনে একটি বেকারির সন্ধান পাওয়া গেছে। গত শনিবার হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন মেডিকেল কলেজ ভবনের একটি তলায় বেকারিটির কার্যক্রম দেখতে পান। সেখানে জমে থাকা পানিও নজরে আসে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জমে থাকা পানি এবং বেকারি থেকে এমন কোনো পদার্থ বা গ্যাস নির্গত হচ্ছে কি না, যা নবজাতকদের জন্য ক্ষতিকর– তা পরীক্ষা করা হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আদ্-দ্বীনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ভেতরে কীভাবে বেকারি পরিচালিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এটি কীভাবে অনুমোদন পেয়েছে, সেটিও তদন্ত করা হবে। তবে হাসপাতালের পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান দাবি করেন, বেকারিটি পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থিত এবং সেখানে বৈদ্যুতিক ওভেন ব্যবহার করা হয়। কোনো গ্যাস ব্যবহার করা হয় না। জমে থাকা পানি থাকলেও তা বেকারির কাজে ব্যবহৃত হয় না।
সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তেজনা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর হাসপাতালের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। গণমাধ্যমকর্মীরা ভেতরে ঢুকতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সাংবাদিকদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে হাসপাতালের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়েও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেননি।
অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, বায়ু চলাচল, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটি বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কিছু নির্মাণত্রুটি পাওয়া গেছে। সেগুলো নবজাতকদের চিকিৎসা পরিবেশে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ওই ওয়ার্ডে রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। এ সময় বিকল্প ভেন্টিলেশনেরও ব্যবস্থা ছিল না।
নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা
গত বুধবার রাতে ময়নাতদন্ত না করার জন্য পরিবারের আবেদনের পর ছয় নবজাতকের লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় রমনা থানায় এক নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করছেন রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশিক ইকবাল। তিনি সমকালকে বলেন, মারা যাওয়া এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তদন্তের স্বার্থে কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।
সেদিন যা ঘটেছিল
গত ২৭ মে বুধবার রাতে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ১১ জন মা ও ছয় নবজাতক ভর্তি ছিলেন। রাত ২টার দিকে এক মা ঠান্ডা অনুভব করায় এসি বন্ধ রাখার অনুরোধ করেন। পরে রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা এসি বন্ধ ছিল।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন দাবি করেন, ফের এসি চালুর কিছু সময় পর একে একে সব নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে সকাল ৬টার দিকে সবার মৃত্যু হয়। তাদের বয়স ছিল এক থেকে তিন দিন।
