খাদ্যশিল্পের চাপে আটকে আছে সতর্কীকরণ লেবেল, বাড়ছে রোগের ঝুঁকি
প্যাকেটের সামনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা চালুর দাবি
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৪০
অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে দেশে। এতে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। এ পরিস্থিতিতে প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষতিকর উপাদান সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতন করতে প্যাকেটের সামনে স্পষ্ট সতর্কীকরণ লেবেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে খাদ্যশিল্পের বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি ও চাপের কারণে এ-সংক্রান্ত প্রবিধানমালার খসড়া চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যশিল্পের হস্তক্ষেপমুক্তভাবে ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ দ্রুত চূড়ান্ত করার দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তাঁদের মতে, প্যাকেটের সামনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তারা খাবারের ক্ষতিকর উপাদান সম্পর্কে সহজে জানতে পারবেন। এতে সচেতনভাবে খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় ‘অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য-প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেল: অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক এ ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়।
ওয়েবিনারে জানানো হয়, গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন। শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে এসব খাবার গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার দীর্ঘমেয়াদে নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু প্যাকেটের পেছনে থাকা জটিল পুষ্টিতথ্য সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সহজে বোধগম্য নয়। ফলে খাবারের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মন্ত্রণালয়ে খসড়া, চূড়ান্তের অপেক্ষা
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাবারের প্যাকেটের সামনে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর লক্ষ্যে প্রবিধানমালার একটি খসড়া তৈরি করেছে। তবে সেটি এখনো খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ওয়েবিনারে জানানো হয়, খাদ্যশিল্পের দেশি-বিদেশি অংশীজনদের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক লেবেলিংয়ের পরিবর্তে স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থা চালু, বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো, ছোট প্যাকেটকে ছাড় দেওয়া এবং স্পষ্ট সতর্কবার্তার বদলে কম দৃশ্যমান বা বিভ্রান্তিকর লেবেল ব্যবহারের মতো বিভিন্ন দাবি তোলা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, প্রবিধানমালার খসড়াটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, প্রবিধানমালাটি দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে। এসব রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ। বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই খাদ্য কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে খসড়া প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী বিজ্ঞানী আবু আহমেদ শামীম বলেন, প্যাকেটজাত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রকৃত পুষ্টিমান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ভোক্তাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল সবচেয়ে কার্যকর।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, এফওপিএল বাস্তবায়ন করা গেলে স্বাস্থ্য ব্যয় কমানোর পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩.৪ অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।
দৈনিক ইত্তেফাকের চিফ রিপোর্টার এম শামসুদ্দীন আহমেদ বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এফওপিএল কার্যকর পদক্ষেপ। খসড়া প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডায়েট-সম্পর্কিত ঝুঁকিবিষয়ক প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাত এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের পরামর্শক আমিনুল ইসলাম সুজন। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন প্রতিষ্ঠানটির কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন। বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞার প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা। এতে নাগরিক সমাজ, এনজিও, যুবসমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
- বিষয় :
- ওয়েবিনার