মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসির আওতায় দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ১৯:৫৯
নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতকে সরাসরি যুক্ত করার উদ্যোগে বড় অগ্রগতি এলো। ‘মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫’-এর আওতায় দেশের প্রথম প্রকল্প হিসেবে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
মঙ্গলবার এই অনুমোদন দেওয়া হয়। টাঙ্গাইলের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ই-ট্রাইক্যাচ টেকনোলজিস। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং দেশের বিদ্যুৎ খাতে বাজারভিত্তিক নতুন ধারার সূচনা।
প্রকল্পটির আর্থিক ও কারিগরি দিক মূল্যায়ন করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সঞ্চালন সক্ষমতা নিয়ে মতামত দিয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি। এছাড়া প্রকল্প এলাকা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও নেসকোর আওতাধীন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলোর মতামতও নেওয়া হয়েছে। সব পক্ষের ইতিবাচক মতামতের ভিত্তিতেই এই প্রকল্পকে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
গ্রিডের বাইরে সরাসরি শিল্পে বিদ্যুৎ
প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিএডিসি কোল্ড স্টোরেজ, কাজী কোল্ড স্টোরেজ, লাবিব গ্রুপ ও এশিয়াটিক গ্রুপের বিভিন্ন কারখানা। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বড় গ্রাহকদের কাছেও বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ রাখা হয়েছে।
মার্চেন্ট মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদক নিজেই ক্রেতা খুঁজে নেয় এবং পারস্পরিক সমঝোতায় মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে সরকার এখানে সরাসরি ক্রেতা নয়, বরং অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা পালন করে।
এই ব্যবস্থায় সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহার করতে হলে উৎপাদককে ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’ দিতে হবে। তবে এই ট্যারিফে কোনো মুনাফা রাখার সুযোগ নেই। কেবল সঞ্চালন ও বিতরণজনিত ব্যয় সমন্বয় করেই হার নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ হার নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে প্রস্তাব জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
খরচ কমার আশা
বর্তমানে গ্রিড বিদ্যুতের জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৫ টাকা ব্যয় করতে হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, মার্চেন্ট পাওয়ার ব্যবস্থায় উৎপাদন ও সঞ্চালন খরচ মিলিয়ে এই ব্যয় ১০ টাকার মধ্যে নেমে আসতে পারে। এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন শুল্ক নীতির কারণে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নতুন করে ভর্তুকি দেবে না সরকার
বিদ্যুৎ খাতে নতুন ভর্তুকি না দেওয়ার অবস্থানে রয়েছে অর্থ বিভাগ। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার শর্ত এবং বাজেটের চাপ দুটিই এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ফলে বাজারভিত্তিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে সরকার।
নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি উৎপাদকরা তাদের উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সরকারকে বিক্রি করতে পারবেন।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাঙ্গাইলের এই প্রকল্প সফল হলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও একই মডেলে বিনিয়োগ বাড়বে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহারও বাড়বে।
- বিষয় :
- বিদ্যুৎ
- বেসরকারি খাত
- সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র
