করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞানী মার্কেল
অ্যাঙ্গেলা মার্কেল
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ০০:৫৬ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
বিশ্ব এখন করোনা ভাইরাস নামের ভয়ানক এক মহামারীতে আক্রান্ত। জার্মান ইতিহাসবিদ ইভা স্লোথুবার এ মহামারীকে বলছেন ‘মনের মহামারী’। রোগটি সারাবিশ্বে যতই ছড়িয়ে পড়েছে, ততই সেটি নিয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে ভুল তথ্যের মহীরুহ। বাস্তবতা আর কল্পনার মাঝামাঝি বিস্তার ঘটেছে অসংখ্য তত্ত্বের, যা একেকটি ছাড়িয়ে গেছে আরেকটিকে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব নেতাদের আরও চিন্তাশীল পথে এগিয়ে যেতে হবে, যে পথ বিজ্ঞান ও যথার্থতার আলোকে যৌক্তিক। অনেকেই হয়তো সেই আলোর পথেই চলছেন, তবে একজন আরও বেশি এগিয়ে। যিনি তার দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসী এবং করোনা মহামারী নিয়ে ঘোলা জল ঘাটেননি, মনের মহামারীতে আক্রান্ত হননি। তিনি যতটা একজন রাজনীতিবিদ, তার চেয়ে বেশি একজন কমান্ডার ইন চিফ, তার চেয়েও বড় একজন বিজ্ঞানী। তিনি অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। জার্মানী নামের ইউরোপীয় দেশটি চালাচ্ছেন এই বিজ্ঞানী।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে, জার্মান নেতা মার্কেল তার স্বভাবসিদ্ধ নিরবতায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে। মহামারীটি একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার কাছে এই মুহূর্তে প্রধানতম চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে নিজের নেতৃত্বের স্টাইলটি বজায় রেখে চলেছেন তিনি, যাকে ধারাবাহিকভাবে বলা যায়-বিশ্লেষণাত্মক, উদ্বেগহীন এবং সতর্ক পদচারণা।
করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে জার্মানির সামাজিক ও অথনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মার্কেল যে পথে এগিয়ে গেছেন, তাতে তিনি বেশকিছু সুবিধাও পেয়েছেন। তিনি দেশের মানুষের সম্মান পেয়েছেন, দেশজুড়ে বৈজ্ঞানিক ও মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় করতে পেরেছেন, জনগণের কঠোর আস্থা অর্জন করেছেন এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তার অবিচল ও বুদ্ধিমত্তার স্টাইল নেতৃত্বে ফিরে এসেছে।
করোনা মহামারীর এই অসময়ে ভয়ানক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেখানে ধীরস্থির থেকে যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া দরকার, সেখানে দীর্ঘ ৩০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে মার্কেল যেন এক আদর্শচূড়া। রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক উভয়ভাবেই মার্কেল কর্মকৌশলে এক সফল যোদ্ধা।
১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে জন্ম নেওয়া মার্কেল বেড়ে উঠেছেন পূর্ব জার্মানিতে বার্লিনের উত্তরে অবস্থিত এক ছোট্ট শহরে। ১৯৮৯ সালের দিকে বার্লিন দেয়ালের পতন হওয়ার সময়ে মার্কেল কোয়ান্টাম কেমেস্ট্রিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তখনই তিনি একজন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে যোগ দেন রাজনীতিতে। রাজনৈতিক জীবনের অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে অবশেষে ২০০৫ সালে আসীন হন জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে। এখনও তিনি জার্মানির ফেডারেল সরকারের প্রধান হিসেবেই আছেন। তার এ উত্থান নাটকীয় ও বিরল, বিশেষ করে পূর্ব জামানির মতো জায়গার একজন নারী হিসেবে। আর যার ব্যাকগ্রাউন্ড আইন বা সিভিল সার্ভিসের নয়। যিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী।
মার্কেল জনসমক্ষে কখনও বলেননি, তিনি কেন বিজ্ঞানকে ছাড়লেন, তবে করোনার এই দুর্যোগে এসে প্রমাণ হলো বিজ্ঞান তাকে ছাড়েনি। মার্কেলের জীবনীকার স্টেফেন কর্নেলিয়াসের কথায়, ‘মার্কেল ছোটবেলা থেকেই শিখেছেন, নিজেকে কখনও আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে নেই। তিনি নিজে এবং তার পরিবার সব সময় পুনর্নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই এগিয়েছেন। ’
কর্নেলিয়াস বলেন, মার্কেল যেমন বিশ্বমন্দার সময় ইউরোপকে বাঁচিয়েছেন আবার অভিবাসীদের ঢলের সময়ও ইউরোপের ভাঙন ঠেকিয়েছেন তিনি, নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করেও।
জার্মানিতে এবার যখন ২৮ জানুয়ারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিল, স্কুলকলেজ বন্ধ হয়ে গেল, দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হলো, তখন তিনি জাতির উদ্দেশে তার চারিত্রিক স্বভাবসুলভ ভঙ্গি এড়িয়ে আবেগীয় এক ভাষণ দিলেন। বললেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর আমাদের জীবনে এমন অন্ধকার সময় আসেনি।
এরপর মহামারীর বিস্তার রোধে তিনি নির্ভর করলেন বিজ্ঞানীদের ওপর। তার নেতৃতে বিজ্ঞানগবেষণা কেন্দ্রগুলো, জনস্বাস্থ্য বিভাগ এবং বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ-সবাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে করোনা মহামারীকে প্রতিরোধ করবার।
বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান অ্যাক্সেল রাডলাক প্রিইস বলেন, জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ লড়াইয়ে জেতার। আর ফেডারেল সরকার মার্কেলের নেতৃত্বে চালিয়ে যাচ্ছে সমন্বয়কের দায়িত্ব। পুরো দেশ যেন একটি একক করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টাস্কফোর্সে পরিণত হয়েছে।
প্রিইস আরও বলেন, মার্কেলের এখনকার চেহারা এমন যেন, তিনি জার্মানির শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী না হলেও এখন বিজ্ঞানীদের প্রধান। দ্য আটলান্টিক অবলম্বনে
