যার মঞ্চভাবনা বদলে দিয়েছে ভারতীয় নাট্যাঙ্গন
বিজয়া মেহতা
বিবিসি
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ২২:০৩ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ২২:১৫
৯২ বছর বয়সে চলে গেলেন ভারতীয় থিয়েটারের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব বিজয়া মেহতা। গত সপ্তাহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এই গুণী ব্যক্তিত্বকে মানুষ মনে রাখবে তার যুগান্তকারী নাট্যপ্রয়াসের জন্য, যা ভারতীয় নাট্যাঙ্গনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে মারাঠি থিয়েটারকে (মূলত মহারাষ্ট্রে) আধুনিক রূপ দেওয়ার প্রধান কারিগর মনে করা হয় তাকে। পারফর্মিং আর্টসের দুনিয়ায় বিজয়া মেহতা প্রভাবশালী একটি নাম।
নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং অভিনয়ের জন্য তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। নানা পাটেকর ও অনুপম খেরের মতো বলিউডের বহু জনপ্রিয় অভিনেতার গুরু ছিলেন তিনি। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য দীর্ঘ জীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বিজয়া। এর মধ্যে অভিনয় ও পরিচালনার জন্য রয়েছে একাধিক ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ এবং আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার প্রদত্ত বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’।
মারাঠি থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও বিজয়া মেহতার জন্ম ১৯৩৪ সালে বর্তমান গুজরাট রাজ্যের ভাদোদরায়। সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম হওয়ায় মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় ক্যারিয়ার গড়া তার জন্য খুবই সহজ ছিল, কিন্তু তিনি বেছে নেন থিয়েটারের জগতকে।
পারফর্মিং আর্টসের দুনিয়ায় ভারতীয় থিয়েটার এমন এক জায়গা যেখানে বরাবরই কোনো গ্ল্যামার নেই। তবে বিজয়া মেহতার কাছে এর কোনো গুরুত্ব ছিল না। কলেজ জীবনে এক অধ্যাপকের অনুপ্রেরণায় মারাঠি নাটকে অভিনয় শুরু করেন তিনি।
এরপর আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের পথপ্রদর্শক ইব্রাহিম আলকাজি এবং আদি মারজবানের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। গুরুদের সেই কাজের চেতনা তিনি নিজের কাজে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
মহারাষ্ট্রের নাট্যপ্রেমীদের কাছে বিজয়া এমন এক নারী, যিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে মারাঠি থিয়েটারকে নতুন রূপ দিয়েছেন। এই পরিবর্তন মধ্যবিত্ত মারাঠি দর্শকদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। কারণ তারা অবশেষে মঞ্চে নিজেদের জীবনের প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিলেন। তার নাটকে ফুটে উঠত মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের জটিলতা, যা দর্শক সহজেই আপন করে নিত।
১৯৬০ সালে বিজয়া মেহতা যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যদল ‘রঙ্গায়ন’। এ বছরই ‘বোম্বে পুনর্গঠন আইন’-এর মাধ্যমে বোম্বে রাজ্য ভেঙে গুজরাটিদের জন্য ‘গুজরাট’ এবং মারাঠিদের ‘মহারাষ্ট্র’ রাজ্যের জন্ম হয়। ‘রঙ্গায়ন’ দলটির হাত ধরে একদিকে যেমন মারাঠি থিয়েটারের সাহসী নাটক মঞ্চস্থ হয়, অন্যদিকে তৈরি হয় একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা ও লেখক।

বিখ্যাত নাট্যকার মহেশ এলকুঞ্চওয়ার ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় লিখেছেন, ''আমি যখন ‘বাই’ (মারাঠি ভাষায় ম্যাডাম বা আপাকে এই নামে ডাকা হতো) এর সঙ্গে হাত মেলালাম, তখনই বুঝলাম আমার আসল ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। শুধু বিনোদন দেওয়া আমাদের লক্ষ্য ছিল না; নাম বা যশ আমাদের ভাবনায় ছিল না। আমরা কাজের মাধ্যমে থিয়েটার, শিল্প ও জীবনকে অন্বেষণ করতে চেয়েছিলাম।''
বিজয়া মেহতা বহু মানুষকে থিয়েটারে আসার পেছনে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের একজন গায়ক ও লেখক স্বানন্দ কিরকিরে। তিনি জানান, বিজয়া মেহতার একটি কর্মশালাই তাকে মঞ্চের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘সেখানকার পরিবেশ এতই মনমুগ্ধকর ছিল যে, সেখানেই থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
বিজয়া মেহতা মারাঠি দর্শকদের পরিচয় করিয়েছেন সংস্কৃত ক্লাসিকের সঙ্গে। একই সঙ্গে বিজয় তেন্ডুলকরের মতো মারাঠি নাট্যকারের নাটক এবং বার্টোল্ট ব্রেখট ও আন্তন চেখভের বিশ্বখ্যাত কাজের রূপান্তরও তিনি এনেছেন মঞ্চে।
তবে তার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুধু থিয়েটারে সীমাবদ্ধ ছিল না। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘রাও সাহেব’ (১৯৮৫), যা ১৯ শতকের মহারাষ্ট্রের একজন সংস্কারবাদী আইনজীবীর জীবন নিয়ে নির্মিত, ‘পেস্টনজি’ (১৯৮৮), যা মুম্বাইয়ের তিনজন পার্সির প্রেম, পরকীয়া ও বন্ধুত্বের কাহিনী নিয়ে নির্মিত।
প্রবীণ অভিনেতা অনুপম খের ‘রাও সাহেব’ চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে এক্স পোস্টে লিখেছেন, ‘ততদিনে আমি কয়েকটি সিনেমা করে ফেলেছিলাম এবং ভেবেছিলাম অভিনয় সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে প্রতিটি রিহার্সাল আমাকে মনে করিয়ে দিত- এই শিল্পের সমুদ্র আসলে কত বিশাল! মানুষের আচরণ নিয়ে তার জ্ঞান ও অসাধারণ সংবেদনশীলতার সামনে আমি সানন্দে আবারও একজন ছাত্র বনে গিয়েছিলাম।’
বিজয়া মেহতা এক দশকেরও বেশি সময় মুম্বাইয়ের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসের’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি যেমন ভারতের শীর্ষস্থানীয় নাট্যকার ও অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তেমনি পিটার ব্রুক, ইউজেনিও বার্বা এবং রিচার্ড শেখনারের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও নানাভাবে যুক্ত ছিলেন।
তাই বলা হচ্ছে, তার প্রয়াণে ভারতীয় নাট্যজগতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। অভিনেত্রী সোনালী কুলকার্নি বলেন, ‘আমার মতো অসংখ্য অভিনেতা ও থিয়েটারকর্মী বিজয়া মেহতার কাছে এমন এক ঋণে আবদ্ধ, যা কখনো শোধ করা যাবে না।’
শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ''আপনার চলে যাওয়া আমাদের ‘ক্ষতি’- এটুকু বলা হবে ভীষণ সামান্য। এতে আপনার অবদানকে ছোট করা হবে। থিয়েটারকে আপনি যে প্রাচুর্য আর সমৃদ্ধি দিয়ে গেছেন, তার প্রতিদান আমরা দিতে পারব না।"
- বিষয় :
- ভারত
- থিয়েটার
- মারা গেছেন
