ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

মুমূর্ষু জিসিসিতে ভাঙনের ঢেউ

মুমূর্ষু জিসিসিতে ভাঙনের ঢেউ
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

গত শতকের আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইরাকের আটবছর ধরে (১৯৮০-১৯৮৮) যুদ্ধকালে প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে সিদ্ধান্তের ফলে বিশেষ করে সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সংগঠন গড়ে তোলে  সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশ। সংস্থাটির নাম দেয়া হয়েছিল গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল, সংক্ষেপে জিসিসি।

৩৯ বছর পরে এসে একসময়ের শক্তিশালী সংগঠনটি এখন অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের কারণে  আজ ভাঙনের মুখে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ এই সঙ্কটের কারণ হলো কাতার।। অন্য সদস্য দেশগুলোর অভিযোগ, প্রাকৃতিক গ্যাসসমৃদ্ধ এই ধনী দেশটি সন্ত্রাসের উস্কানিদাতা হিসেবে কাজ করছে। এরপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে ২০১৭ সালের ৫ জুন কাতারের বিরুদ্ধে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে দেশটির ওপর অবরোধ আরোপ করে অন্য সদস্য দেশগুলো। চলতি বছর  অবরোধের তৃতীয় বর্ষ চলছে। আর এর মধ্য দিয়ে জিসিসির ভাগ্যে ভাঙনের কালো মেঘ স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে দেশগুলোর ঐক্যপ্রচেষ্টা। কূটনৈতিক স্থবিরতা ও করোনা-মহামারির মধ্য দিয়ে গতমাসে সংগঠনের ৩৯তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বর্তমান মহাসচিব নায়েফ আল হাজরাফ এক বিবৃতিতে সংগঠনের  ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে ১৯৮১ সালের ২৫ মে  দুবাইতে জিসিসি উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

জিসিসির লক্ষ্য ছিল উপসাগরীয়  অঞ্চলে বাইরের  হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সমন্বয় করা। এছাড়া কৃষি, প্রাণী, শিল্প, এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিখরচায় বাণিজ্য চালানো এবং জাতীয় আয়ের উৎস প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। ১৯৮১ সালের নভেম্বরে একটি ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৮২ সালে এর অনুমোদন দেয়া হয়। প্রায় পাঁচ কোটি জনসংখ্যার এই অঞ্চলে  বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি জাগ্রত করা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে উৎসাহিত করাটাও ছিল এর লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত।

১৯৮৪ সালে পেনিনসুলা শিল্ড নামের একটি যৌথ ক্ষেত্রও সৃষ্টি করে দেশগুলো। উদ্দেশ্য বাইরের কোনো শক্তি আক্রমণ বা উস্কানিমূলক কিছু করলে ছয় সদস্যের সবাই এক সঙ্গে এর মোকাবিলা করবে।

১৯৮৭ জিসিসিভুক্ত দেশগুলো  যে কোনো একটির ওপর যে কারো আগ্রাসন বা হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরে নিয়ে এক সঙ্গে মোকাবিলার কথাও বলা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও ১৯৯০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যখন রাতারাতি কুয়েত দখল করে নিলেন, তখন দেখাগুলো আক্রান্ত কুয়েত ছাড়া অন্য সদস্য দেশগুলো মোটামুটি নীরব ভূমিকাই পালন করতে থাকে।

২০১১ সালে বাহরাইন ছাড়া ‘আরব বসন্ত’ নামে  পরিচিত  গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভগুলোতে জিসিসি সদস্যদের বেশিরভাগই এড়ানোর কাজে ব্যস্ত ছিল।তবে  জিসিসি প্রতিরক্ষা চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাহরাইনের অনুরোধে প্রায় ১,০০০ সৌদি সেনা সরকারী সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করতে দেশটিতে প্রবেশ করেছিল। কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে হত্যা ও অনেককে গ্রেপ্তার করে  বিদ্রোহ দমন  করা করা হয়েছিল, অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল।
কিন্তু এতসব কিছুর পরেও কাতারের সঙ্গে পেরে উঠছে না সদস্য দেশগুলো। উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসি’কে ‘দাঁতহীন বাঘ’ বলে আখ্যায়িত করেছে কাতার। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাসিম আলে সানি ছয় জাতির এই সংস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গঠন কাঠামো ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন।

জিসিসি’র মহাসচিব আব্দুল লতিফ বিন রাশিদ আল-জায়ানি এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাওয়ি বিন আব্দুল্লাহ কাতারের রাজধানী দোহায় আলে সানির সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান।
এসময় কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জিসিসি পরিচালনার গঠনতন্ত্রের আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে জিসিসি গঠিত এবং রিয়াদে এই সংস্থার সদর দফতর অবস্থিত।এর আগে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলে সানি প্রথমবারের মতো বলেন, সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা চলছে তার কোনো দাঁত নেই এবং এ সংস্থা এখন সদস্য দেশগুলোকে জবাবদিহি করার ক্ষমতা রাখে না।

দোহা ফোরাম ডায়ালগের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, তারা কিছু কৌশল তৈরি করে রেখেছে এবং তারা কখনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না কারণ এসব দেশ মনে করে তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়।

উল্লেখ্য, সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জিসিসি’র সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ২০১৭ সালের জুন মাসে এসব দেশ কাতারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেশটির ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে।

আরও পড়ুন

×