সমকাল এক্সপ্লেইনার
ট্রাম্পের ২০ দফায় নোবেলের ছায়া, গাজায় শান্তি কতদূর
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের ২ বছর পূর্তি
তাঁবুতে যুদ্ধদিনের ক্ষত স্পষ্ট। এর মাঝেই হাস্যোজ্জ্বল ফিলিস্তিনি শিশুরা। মঙ্গলবার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:০১ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:২২
দুই বছর আগের ৭ অক্টোবর। বিশ্বে নতুন ইতিহাসের সূচনা ও একটি ভূখণ্ডের মানুষের ভাগ্যে নির্মমতা নেমে আসার দিন।
এই দুই বছরে বিশ্ববাসী প্রতিদিন একসঙ্গে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর শুনেছে। গণহত্যা দেখেছে, সাক্ষী হয়েছে দুর্ভিক্ষের। পাশাপাশি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অন্তত একটি বিষয়ে কোটি কোটি মানুষ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। সেটি হলো- গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা।
আল জাজিরার তথ্য, দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর মধ্যস্থতায় অন্তত আটবার যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ভেস্তে গেছে। নতুন করে আবার যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা সামনে এনেছে ইসরায়েলের পরম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন গাজা পুনর্গঠনে- যে তথ্য অনেকেরই জানা।
প্রশ্ন উঠেছে, গণহত্যা ও ধ্বংস বন্ধে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটুকু? আগামী ১০ অক্টোবর শান্তিতে নোবেল জয়ীর নাম ঘোষণা হবে। নিজেকে শান্তির দূত দাবি করা ডোনাল্ড ট্রাম্প কি এর আগে তাঁর ‘ল্যাসে ফেয়ার (যা হওয়ার হবে)’ অবস্থান থেকে সত্যিকার অর্থেই সরে আসবেন?
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, কেবল ট্রাম্পের একার উদ্যোগে যুদ্ধ বন্ধ হবে না। যদি তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়নের জোর উদ্যোগ নেওয়া হয়; তবুও তাতে যুদ্ধরত দুই পক্ষ হামাস ও ইসরায়েলকে সম্মত হতে হবে। এখন দেখা যাক- এই প্রস্তাবে কোন পক্ষের সম্মত হওয়ার বাস্তবতা কতটুকু।
অস্পষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রস্তাব
প্রথমত, ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনায় বেশকিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা আছে। আপনি যদি এসব প্রস্তাব আরেকবার পড়তে চান তাহলে ‘এখনই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় যেভাবে চলবে গাজা’ এই লিংকে ক্লিক করুন।
গাজাবাসী ও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর অন্যতম দাবি হলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু ২০ দফা প্রস্তাবে কবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ইয়াল মায়র্জের মতে, পরিকল্পনাটি অসংগতি ও ফাঁকিতেও ভরা। আর স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। তবে আপাতত এটিই যুদ্ধ বন্ধের শক্তিশালী সমাধান বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এখানে আরব দেশসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আছে। সম্ভবত গত দুই বছরের শান্তি উদ্যোগগুলোর চেয়ে এটি বেশি সমর্থন ও বৈধতা অর্জন করেছে। তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে ইসরায়েল ও হামাস উভয়পক্ষকেই বড় ছাড় দিতে হবে।
সম্প্রতি ট্রাম্প এই প্রস্তাব তুলে ধরার পর তাতে সম্মতি দেওয়ার কথা জানান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। হামাসের সঙ্গে এ নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, হামাস প্রস্তাবে রাজি না হলে এর পরিণতি ভোগ করবে। ইসরায়েল গাজায় যা করতে চায় তাই করবে, যুক্তরাষ্ট্রও তাতে সমর্থন দেবে।
দ্য কনভারসেশনের নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রস্তাবে হামাসের জন্য কিছু সুবিধা আছে। তা হলো- ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করবে। মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেবে এবং মুক্তি দেবে অনেক ফিলিস্তিনি বন্দিকে। তবে এর পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও আছে। কারণ, ট্রাম্পের প্রস্তাবে গাজায় ফিলিস্তিনিদের শাসন কবে ফিরবে তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ নেই। স্পষ্টভাবে গাজা ও পশ্চিম তীরকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিও নেই। উল্টো হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ফিলিস্তিনের রাজনীতির বাইরে থাকার শর্ত আছে। এতে রাজি হলে হামাস কার্যত তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব হারাবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের জন্য শান্তি পরিকল্পনাটি গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাভ এনে দেবে। যেমন সব বন্দির প্রত্যাবর্তন (জীবিত বা মৃত) এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।
ইসরায়েলে বর্তমানে কট্টরপন্থী সরকার ক্ষমতায়। প্রস্তাবে রাজি হলে তাদেরও কিছু মূল্য দিতে হবে। যেমন- সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগকারী হামাস যোদ্ধাদের সাধারণ ক্ষমা করা, আড়াই’শ ইসরায়েলি নাগরিককে হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত অনেক ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া, গাজা ও পশ্চিম তীর সংযুক্ত করে বৃহত্তর ইসরায়েলের চিন্তা থেকে সরে আসা।
আরব ও মুসলিমপ্রধান দেশের সমর্থন
অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও অন্তত স্বল্পমেয়াদে কয়েকটি কারণ ট্রাম্পের পরিকল্পনার সফলতার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমর্থন। বিশেষ করে আরব ও মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর। এর ফলে হামাস আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র কাতার ও তুরস্কও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছে। আবার নিকট ভবিষ্যতে যুদ্ধ বন্ধে অন্য কোনো পরিকল্পনার সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে না কেউ। ফলে ট্রাম্পের পরিকল্পনার কিছু প্রস্তাব মেনে নিতে অনেকটা বাধ্য হয়েছে হামাস।
হামাসের হাতিয়ার দুর্বল হচ্ছে
গত দুই বছরে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে হামাসের প্রধান হাতিয়ার ছিল জিম্মিরা। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- এটি কার্যকর হওয়ার প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই জীবিত ও মৃত সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ। হামাস এটি করলে মূলত তাদের আলোচনার হাতিয়ারটি হারাবে। বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতে ইসরায়েলি হামলা হলে, তারা আর জিম্মিদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাবে না।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, কাতারে অবস্থানরত হামাস নেতাদের সম্প্রতি বোঝানো হয়েছে যে জিম্মিদের ধরে রাখাটা উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, নেতানিয়াহুর সরকার আর জিম্মিদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। বরং গাজা সিটিতে তাদের উপস্থিতিকে সামরিক অভিযানের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।
পশ্চিমাদের দুই নীতি
সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের শর্ত ছিল, হামাসকে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া যাবে না। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ইয়াল মায়র্জের মতে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর এই শর্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
প্রকৃত ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নিজেদের সরকার নির্বাচনের অধিকার থাকা। ইয়াল বলছেন, পশ্চিমারা সব সময় গণতন্ত্র, স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে তারাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে নির্বাচনে কোন দল অংশ নিতে পারবে আর কে পারবে না। এটি তাদের নীতির বৈপরীত্য প্রকাশ করছে।
কিন্তু হামাসকে যদি নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয় এবং তারা যদি জিতে যায় তখন কী হবে? ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের শীতল কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি ঝুঁকি তাই থেকেই যায়।
গাজায় শান্তি কতদূর
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে মিশরে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে হামাসের নেতারাও যোগ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি মঙ্গলবার আরও জানিয়েছে, এখানে চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে। তবে এর আগে কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে গতকাল সোমবার হোয়াইট হাউসে কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, আলোচনার সময় হামাস কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে।
কিন্তু ইসরায়েল কী করছে? যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা প্রস্তাব হামাস আংশিকভাবে মেনে নেওয়ার পর সম্প্রতি ইসরায়েলকে হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন ট্রাম্প। কিন্তু ইসরায়েল তা উপেক্ষা করে গত শনিবার উপত্যকার বিভিন্ন অংশে হামলা করে। এতে অন্তত ৭০ জন প্রাণ হারান।
ইয়াল মায়র্জ বলছেন, শান্তির পথে অগ্রগতি আনতে হলে ইসরায়েলে সহনশীল সরকার দরকার। বিশেষ করে যারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে কিছুটা হলেও ত্যাগ স্বীকার বা ছাড় দেবে। তবে এ বিষয়ে দেশটির পরবর্তী নির্বাচনের (২০২৬) আগে আগে বড় কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তাই গাজা যুদ্ধের অবসান এখন কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজিরবিহীন ঐক্যের ওপর নির্ভর করছে। ইয়াল ময়ার্জ বলছেন, প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সময়েও বিশ্ব নেতারা যদি গাজায় শান্তি বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দেন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন উভয়পক্ষের মধ্যপন্থীরা যদি আওয়াজ তোলে তবেই আজকের ক্ষীণ আশার আলো একদিন বাস্তবে শান্তি পথ হয়ে উঠতে পারে।
