বিশ্লেষণ
গ্রিনল্যান্ড: ট্রাম্পের চাপে ইউরোপও কেন ছাড় দিতে পারে
গ্রিনল্যান্ডের নুক উপকূলে পানিতে ভাসছে বরফখণ্ড। ফাইল ছবি: এএফপি
আলজাজিরা
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৫:১০ | আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৩:০৪
ছোট দেশগুলো বড় ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাতে গ্রাস হওয়া ঠেকাতে কী করতে পারে? গ্রিনল্যান্ডের জন্য এই প্রশ্নটি এখন আর তাত্ত্বিক নয়। এটি বাস্তব এবং তীব্র। এর সহজ কোনো উত্তরও নেই। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি ভূখণ্ড। ২০০৯ সাল থেকে এটি মূলত স্বশাসিত এবং নিজেরা চাইলে স্বাধীনতার পথে এগোনোর অধিকার রাখে। দেশটির সব রাজনৈতিক দলই স্বাধীনতা চায়। তবে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এখনও দূরের লক্ষ্য হওয়ায় আপাতত ডেনমার্কের সঙ্গেই আছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে স্বাধীনতার হিসাব বদলে যেতে পারে। তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে চান। ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর বিষয়টি নিয়ে আর সন্দেহ নেই যে, ট্রাম্প এ নিয়ে একেবারেই ‘সিরিয়াস’। হোয়াইট হাউস সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলেছে। যদিও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত সামরিক শক্তি ব্যবহারের চেয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি করতেই বেশি পছন্দ করবেন।
_1768381717.jpg)
এ কারণে ইউরোপ বর্তমানে কূটনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর প্রধান নিরাপত্তা দাতা যুক্তরাষ্ট্র কোনো সদস্য দেশের ভূখণ্ড দখল করতে পারে, এই ধারণা কিছুদিন আগেও অবিশ্বাস্য মনে হতো। কিন্তু এখন আর তা নয়।
তাহলে ডেনমার্কের মিত্ররা কি এই পরিস্থিতি ঠেকাতে পারবে?
অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি সেনা পাঠান, গ্রিনল্যান্ড সম্ভবত কয়েকদিনের মধ্যেই, এমনকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেও দখলে চলে যেতে পারে। সেখানে থাকা ডেনমার্কের বাহিনীকে কটাক্ষ করে ‘দুটি কুকুরের টানা স্লেজ বা গাড়ির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কথাটি বাস্তবসম্মত না হলেও তাঁর মূল বক্তব্যটি সত্য। গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা অত্যন্ত সীমিত। সেখানে ডেনমার্কের যৌথ আর্কটিক কমান্ডের শক্তি বলতে হাতে গোনা কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল।
বিপরীতে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সামরিক ঘাঁটি আছে। ১৯৫১ সালের এক চুক্তির আওতায় এই ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এটি ওয়াশিংটনকে দ্বীপটিতে আরও ঘাঁটি গড়ার সুযোগও দিয়েছে। বর্তমানে সেখানে নিয়োজিত সদস্য প্রায় ৬৫০ জন। তাদের মধ্যে বিমানবাহিনী ও স্পেস ফোর্সের সদস্যরাও আছেন।
এদিকে কোপেনহেগেনও (ডেনমার্কের রাজধানী) প্রস্তুতি জোরদার করছে। আর্কটিক অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় অতিরিক্ত ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে ডেনমার্ক। পাশাপাশি আরও ১৬টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনছে (যুক্তরাষ্ট্র থেকে)। তবু পূর্ণ শক্তিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হলে ডেনমার্কের টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
_1768381259.jpg)
এই বাস্তবতায় একটি কূটনৈতিক ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলা হয়েছে। ট্রাম্প সৃষ্ট অন্যান্য সংকটের মতোই ইউরোপের নেতারা এমন এক কৌশল নিচ্ছেন, যাকে বলা যেতে পারে ট্রান্সআটলান্টিক জুডো। জুডোর কুস্তিগিরদের মতো তারা ট্রাম্পের শক্তি, তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন। পাশাপাশি তাঁকে ট্রান্সআটলান্টিক বহুপাক্ষিকতার ব্যাপারে বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
মূলত তারা এ কথাই বলছেন, ‘হ্যাঁ, ডোনাল্ড, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে আপনি একদম ঠিক কাজটি করেছেন। আমরা পুরোপুরি একমত। গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালানো সমাধান কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। তবে ন্যাটোই এর সমাধান।’
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের কাছে থেকেও এই বার্তা শোনা গেছে। ব্রিটেন ও জার্মানির সরকারও আর্কটিক নিরাপত্তা জোরদার করতে গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটো বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে। বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে জার্মানির একটি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়েছিল।
_1768381309.jpg)
ইউরোপ যেখানে এই ‘জুডো’ কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করছে, সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদ্ধতি অনেকটাই ‘সুমো’ খেলার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ভূরাজনৈতিক শক্তি হাতে নিয়ে তিনি অনড় অবস্থানে আছেন। বিভ্রান্ত ইউরোপীয়দের সব অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁর মনোভাব বদলায়নি।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে যে খেলা চলছে, তা অনেকটা এরকম। ইউরোপীয়রা যখন বলে, ডেনমার্কের সঙ্গে ১৯৫১ সালের চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে যত খুশি সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে, তখন ট্রাম্প আরও বেশি কিছু প্রত্যাশার কথা বলেন। আবার ইউরোপীয়রা যখন সতর্ক করেন- গ্রিনল্যান্ড একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা হলে ন্যাটোর অবসান ঘটবে, তখন ট্রাম্প কাঁধ ঝাঁকান, যেন সেটাই তিনি চাইছেন। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন গ্রিনল্যান্ড দখলে নেবে- এমন দাবির বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি কেবল একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন।
_1768381569.jpg)
তুষ্টিকরণ কিংবা আত্মসমর্পণের পথও খোলা আছে। ইউরোপীয়রা যদি সত্যিই আতঙ্কিত হয়, তাহলে তারা গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা সংক্রান্ত গণভোট আয়োজনে ডেনমার্কের ওপর চাপ দিতে পারে। গ্রিনল্যান্ডবাসী যদি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব বেছে নেয়, তাহলে ইউরোপ বলতে পারবে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ কি হবে সেটি আর তাদের ভাবার বিষয় নয়। কিন্তু পরিস্থিতি আপাতত সে অবস্থায় যায়নি।
এই মুহূর্তে ইউরোপীয় নেতারা কোপেনহেগেন ও নুকের (গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী) পাশে আছে। তারা বলছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।
সামনে যে পথটি ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে, তা হলো এক ধরনের আপসকে সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া। সেটি হতে পারে গ্রিনল্যান্ডের বিপুল ধাতু ও বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত কোনো চুক্তি। পাশাপাশি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হতে পারে। এতে একদিকে ট্রাম্প নিজে জয়ী ভাববেন, অন্যদিকে ইউরোপও ন্যাটোর ভাঙন ঠেকিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।
